আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়ির সামনে তোলা এই ছবিটি। এক টুকরো পলিথিনের ওপর এক রিকশাশ্রমিক নামাজে মগ্ন। চারপাশে ধুলো, জঞ্জাল, অবহেলা। অথচ তাঁর দুই হাত আকাশের দিকে উদয়মান হয়ে মাথা নত এক গভীর প্রার্থনায়।

পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাড়িটি, যে বাড়ির প্রতিটি দেয়াল বয়ে বেড়ায় একটি জাতির জন্ম, স্বপ্ন ও রক্তাক্ত ইতিহাস। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে বাড়ি দেখেছিল একটি পরিবারের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, আজ সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃস্ব শ্রমজীবী মানুষ।

কী অদ্ভুত ইতিহাসের পরিহাস! যাঁরা ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতির রাজনীতি করেন, তাঁদের অনেকের চেয়ে এই অজ্ঞাত রিকশাশ্রমিক হয়তো ইতিহাসকে অনেক বেশি গভীরভাবে অনুভব করেন। তিনি কোনো বক্তৃতা দিচ্ছেন না, কোনো স্লোগান দিচ্ছেন না, কোনো প্রতিদান চাইছেন না। শুধু মাথা নত করে প্রার্থনা করছেন।

হয়তো তাঁর মোনাজাতের ভাষা আমরা শুনতে পাইনি। কিন্তু ছবিটি যেন নিজেই সেই প্রার্থনার অনুবাদ করে দেয়-

“যিনি এই জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যে মানুষটা তাঁর পুরোটা জীবন একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিতে দান করলেন অকাতরে, বাংলাদেশের জন্মদাতা এমন মহিরুহ এই আত্মাকে শান্তি দাও। এই জাতিকে তার ইতিহাস ভুলে যেতে দিও না।”

এই মানুষটি হয়তো ইতিহাসের বই পড়েননি। প্লেটোর দর্শন জানেন না, রাজনীতির জটিল তত্ত্ব বোঝেন না। কিন্তু তিনি জানেন কার সামনে মাথা নত করতে হয়। জানেন, কোন স্মৃতি কেবল একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির।

এই কারণেই তাঁর নামাজ নিছক ধর্মীয় আচরণ নয়। এটি কৃতজ্ঞতার ভাষা। এটি স্মৃতির প্রতি আনুগত্য। এটি এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ। যে প্রতিবাদ বলে, ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যে মানুষটি একটি জাতির মুক্তির জন্য জীবন দান করলেন, তাঁকে মুছে ফেলার চেষ্টাকারীরাও যেন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়।

একদিকে ক্ষমতার জাঁকজমক, অন্যদিকে এক টুকরো পলিথিন। একদিকে বিস্মরণে ভুলিয়ে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে এক সাধারণ মানুষের নিঃস্বার্থ প্রার্থনা। ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত কোনটি বেশি সত্য, সেই প্রশ্নই রেখে যায় এই ছবি।

একজন রিকশাশ্রমিকের দুই হাত যেন শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্য ওঠেনি; উঠেছে একটি জাতির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও স্মৃতির জন্য। এই ছবি তাই নিছক আলোকচিত্র নয়। এটি একটি আয়না, যেখানে আমরা দেখতে পাই আমাদের ইতিহাস, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের লজ্জা এবং আমাদের দায়।

একটি ভাঙা বাড়ি। এক টুকরো পলিথিন। এক ক্লান্ত রিকশাশ্রমিক। আর আকাশের দিকে ওঠা দুটি হাত। এই সামান্য দৃশ্যই কখনো কখনো একটি জাতির সমগ্র ইতিহাসের চেয়ে বেশি কথা বলে। ধানমণ্ডি-৩২, বাংলাদেশের বাড়ি। যে বাড়িতেই স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়, যে বাড়ি হায়েনা পাকিস্তানীদের বুকে ভয়ের কাপন তুলেছিল, সেই বাড়িটি ভেঙেছে সেই পুরনো শকুনেরা। এই বাংলার মুক্তি জাগরণের বাড়ির সামনে এই রিকশাওয়ালার নামাজের নামই বাংলাদেশ। আর পেছনে দেদীপ্যমান গূঢ়কথায় মাথা উঁচু করে ধানমণ্ডি-৩২, বাংলাদেশের বাড়ি।

আমরা যেন ভুলে না যাই। জাতীয় পতাকা খামচে ধরেছে আবারো পুরোনো শকুন। বাংলার আপামর জনগণ আবারো বজ্র হয়ে বিদ্ধ করবে সকল হায়েনাদের। সময় আসন্ন।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version