আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

কথিত জুলাই এক নারকীয় মেটিকুলাস ডিজাইনের পারফরম্যান্স। জুলাইয়ের বানানো গল্পে কিছু স্টিল ছবি ছিল যেগুলো শুধু ছবি ছিল না, সেগুলো হয়ে উঠেছিল প্রতীক, স্লোগান, আবেগ, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বয়ানের হাতিয়ার। একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী- এই পুরোনো সত্যটি জুলাইয়ের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ঘটনাপ্রবাহে যেন নতুন করে প্রমাণিত হয়েছিল!

কিন্তু প্রশ্ন হলো- একটি ছবির ফ্রেমের বাইরে কী ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কথিত জুলাইয়ের অনেক ‘বীরত্বগাথা’, অনেক ‘নির্যাতনের কাহিনি’ এবং অনেক ‘ভাইরাল প্রতীক’-এর পেছনে উঠে আসতে পারে একেবারেই ভিন্ন এক বাস্তবতা।

তন্বী নামের এই তরুণীর ছবিও তেমনই একটি ছবি। যে ছবি জুলাইয়ের ষড়যন্ত্রের আন্দোলনের আবেগঘন প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ভাঙা চশমা, মুখে রক্তের মতো লাল দাগ, আতঙ্কিত মুখ, ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মতো। ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নানা ব্যাখ্যা, নানা বয়ান, নানা রাজনৈতিক আবেগ। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক স্থানে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর জুলাইয়ের জঙ্গীপক্ষ পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে ভিসি চত্বরে অবস্থান নেয়। ক্যাম্পাসের বাসগুলোর ভেতরেও অনেকে আশ্রয় নেয়। তখন কয়েকজন নারী সামনের দিকে অবস্থান নেন এবং তাঁদের আড়ালে পুরুষদের অবস্থান ছিল। এসব ছিল মেটিকুলাস ডিজাইনের ধাপের পর ধাপ। তন্বী নামের ওই তরুণী হাতে একটি প্লাস্টিকের পাইপ নিয়ে বাস থেকে বেরিয়ে আসার সময় বাস ও ফুটপাতের মাঝের সংকীর্ণ স্থানে পা আটকে পড়ে যান। পড়ে গিয়ে তার চশমার কাচ ভেঙে মুখে আলতো করে লাগে।

এরপর?
এরপর তন্বীর সাথে থাকা অন্যান্য সব দেশবিক্রির ঠিকাদারেরা দ্রুত তন্বীর মুখে টোম্যাটোর সস ছিটিয়ে দেয়।

এরপর একটি ছবি। আর সেই ছবিই হয়ে উঠল একটি রাজনৈতিক গল্পের কেন্দ্রবিন্দু।

প্রশ্নটা এখানেই। একটি ছবি কি সম্পূর্ণ সত্য? একটি ছবিকে ঘিরে তৈরি করা গল্পই কখনও কখনও সত্যের জায়গা দখল করে নেয়! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা প্রায়ই দেখি ঘটনার আগে-পরে কী হয়েছিল, তা কেউ জানতে চায় না। মানুষ শুধু একটি ফ্রেম দেখে। সেই ফ্রেমে যদি থাকে রক্ত, কান্না, ভাঙা চশমা কিংবা আতঙ্কিত মুখ, তাহলেই তৈরি হয়ে যায় একটি সম্পূর্ণ বয়ান।

কে প্রথম আক্রমণ করেছিল? ঘটনার কয়েক মিনিট আগে কী হয়েছিল? ছবির মানুষটি কী করছিলেন? ছবিটি তোলার ঠিক আগের মুহূর্তে কী ঘটেছিল? এসব প্রশ্ন অনেক সময় হারিয়ে যায় আবেগের ভিড়ে। আর তখনই একটি ছবি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র।

জুলাই ষড়যন্ত্রের মেটিকুলাস ডিজাইন সম্বলিত আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আবেগ। কিন্তু সেই আবেগই ছিল সবচেয়ে বড় অস্ত্রও। কারণ আবেগের সময়ে মানুষ প্রমাণ খোঁজে না, প্রশ্ন করে না, উৎস যাচাই করে না। একটি ছবি দেখেই সিদ্ধান্ত নেয়, কে অপরাধী, কে নির্যাতিত, কে নায়ক, আর কে খলনায়ক।

কেউ যদি সেই মুহূর্তে প্রশ্ন তোলে, তাকে বলা হয় ‘বিরোধী’। কেউ যদি বলে, “ঘটনাটির অন্য একটি বর্ণনাও তো থাকতে পারে”- তাকে বলা হয় ‘দালাল’। কেউ যদি জানতে চায়, “ভিডিওটা কোথায়? সম্পূর্ণ ফুটেজ কোথায়? প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন?” তাকে বলা হয় পাল্টা ‘ষড়যন্ত্রকারী’। এভাবেই প্রশ্নহীনতা ধীরে ধীরে বিশ্বাসে পরিণত হয়। আর বিশ্বাস যখন রাজনৈতিক হয়ে যায়, তখন সত্যের প্রয়োজন পড়ে না।

জুলাইয়ের জঙ্গী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই। ঘটনাগুলো শুধু ঘটেনি, ঘটনাগুলোর বয়ানও নির্মিত হয়েছে। কে কতটা আঘাত পেয়েছে, কে কাকে আক্রমণ করেছে, কোন ছবি কীভাবে ছড়িয়েছে। এসবের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন নতুন ‘প্রতীক’।

কেউ সেই প্রতীকের ওপর দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় হয়েছে। কেউ রাজনৈতিক পরিচয় পেয়েছে। কেউ পদ পেয়েছে। কেউ আবার ইতিহাসে নিজের জন্য কল্পিত একটি বিশেষ জায়গা তৈরি করে ফেলেছে। এর আগে আমরা দেখেছি জুলাইয়ের ষড়যন্ত্রের আন্দোলনের সময় জুলাই সন্ত্রাসীরা নিজেরা ভিডিও করে পুলিশের কথিত ‘অত্যাচার’ বয়ান তৈরি করে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে। সত্য বড্ড নিখাঁদ। যত মিথ্যা আবরণ দিয়ে ঢাকা দেয়া হোক না কেন, সত্য ঠিকরে বেরিয়ে আসেই।

কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। আজ যে ছবি আবেগ তৈরি করে, কাল সেই ছবির পেছনের গল্পই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে পারে।

তাই তন্বীর ছবিকে ঘিরে ওঠা বয়ানও প্রশ্নের বাইরে নয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রমাণ করে এতদিন যে গল্পটি প্রচার করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। কারণ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু পাল্টা গল্প বললেই হয় না, প্রমাণ, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শী এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন হয়।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। জুলাইয়ের বানোয়াট আবেগ নির্মাণের গল্পকে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করা যাবে না। কারণ ইতিহাস কোনো ফেসবুক পোস্ট নয়। ইতিহাস কোনো ভাইরাল ছবি নয়। ইতিহাস কোনো একপক্ষের তৈরি ক্যাপশনও নয়।

ইতিহাস হলো- ঘটনার আগে কী হয়েছিল, ঘটনার সময় কী হয়েছিল এবং ঘটনার পরে কীভাবে একটি বয়ান নির্মিত হয়েছিল-এই তিনটি স্তরকে একসঙ্গে দেখা।

যারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকার পতনের নীলনকশা কথিত জুলাইয়ের প্রতিটি ছবিকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য আজকের প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন করতেই হবে। কারণ যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ খুব সহজেই আবেগের হাতে প্রতারিত হয়। জুলাই একটি সামষ্টিক প্রতারণার নাম। আর যে প্রজন্ম একটি ছবিকে সত্যের শেষ শব্দ মনে করে, তারা একদিন আবিষ্কার করতে পারে, ছবির ফ্রেমের বাইরে আরও অনেক কিছু ছিল। সেই অদৃশ্য অংশটাই ছিল আসল গল্প।

আর মেটিকুলাস ডিজাইনের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় ‘গোমড়’ সম্ভবত সেখানেই। যে গল্প আমরা দেখেছি, সেটাই পুরো গল্প ছিল না। তন্বীরা টোম্যাটোর সস দিয়ে যে নৃশংসতার বয়াণে কাজ করেছে, সকল তন্বীরা একদিন বিচারের আওতায় আসবেই। সময় নির্মেঘ নিরুত্তাপ উদাসীনতায় থাকেনা, সময় সত্যকে পাহাড় ঠেলেও সামনে নিয়ে আসে। প্রকৃতির এই-ই রীতি। সকল ষড়যন্ত্রের বিচার হবেই। সকল প্রতারণার একদিন বিচার হবেই।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version