পাকিস্তানের জাতীয় কবি হিসেবে পরিচিত দার্শনিক কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের লেখায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দার্শনিক মূল্যায়নের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার মূল ভাবের সঙ্গে তাঁর প্রথম দিকের ফারসি কাব্যগ্রন্থ ‘আসরার-ই-খুদি’ (Asrar-e-Khudi)-এর ভূমিকার বক্তব্যের মিল রয়েছে।

‘আসরার-ই-খুদি’ বা ‘The Secrets of the Self’ ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে ইকবাল মানুষের আত্মসত্তা, আত্মপরিচয়, কর্ম, নৈতিকতা ও আত্মোন্নয়নের দর্শন তুলে ধরেন। তাঁর ‘খুদি’ দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করা এবং নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তে কর্ম ও আত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমে জীবনকে অর্থবহ করে তোলা।

ইকবালের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা রয়েছে। সেখানে তিনি ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের চিন্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগের ধারণাকে গুরুত্ব দেন। ইকবালের ব্যাখ্যায়, কর্ম মানুষের স্বভাবেরই অংশ এবং জীবনকে সচল রাখার জন্য কর্ম অপরিহার্য।

ইকবালের এই মূল্যায়ন কেবল ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ ছিল না; বরং ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে তাঁর গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগেরও পরিচয় বহন করে। শ্রীকৃষ্ণ, রামানুজ ও শঙ্করাচার্যের দর্শন নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে গীতার কর্মতত্ত্ব তাঁর নিজের ‘খুদি’ দর্শনের সঙ্গে কিছু জায়গায় সাদৃশ্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ইকবালের শ্রদ্ধার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর উর্দু রচনায়। সেখানে তিনি কৃষ্ণের বাঁশির সুরকে ‘সারূদ-ই-রব্বানি’- অর্থাৎ ঐশী সুর হিসেবে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কৃষ্ণকে ভারতের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেছেন।

ইকবালের এই দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ এশিয়ার বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে- নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থেকেও অন্য ধর্ম ও দর্শনের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষাকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা যায়। তাঁর লেখায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা সেই বৌদ্ধিক সংলাপেরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version