দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক। অনেকের দাবি, নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার না করলেও আগের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত বিল এসেছে। কেউ বলছেন, মিটারের রিডিং ঠিক থাকলেও ইউনিট অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, আবার কেউ অভিযোগ করছেন নিয়মিত রিডিং না নিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বিল তৈরি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, বিচ্ছিন্ন কিছু ভুল ছাড়া গণহারে অতিরিক্ত বিল করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলো পৃথকভাবে তদন্ত করছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীর মাসিক বিদ্যুৎ বিল দীর্ঘদিন ধরে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও জুন মাসে সেই বিল হঠাৎ প্রায় ৭ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়। পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় বিল পরিশোধ করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। জুলাই মাসেও মিটারে ৫০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার দেখানো হয়েছে।
গ্রাহকের পরিবারের দাবি, নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। বাড়ির সব বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখে মিটার পরীক্ষা করেও কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। তাদের হিসাবে দৈনিক গড়ে ১০ ইউনিট ব্যবহার হলেও মাসিক ব্যবহারের পরিমাণ ৩০০ ইউনিটের বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ বিলে প্রায় ৬০০ ইউনিট দেখানো হয়েছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি বহুতল ভবনের এক বাসিন্দার অভিযোগ, মিটার পরীক্ষা করে কোনো ত্রুটি না পেলেও ইউনিট অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিল পরিশোধের শেষ সময় চলে আসায় তাকে বিল দিতে হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ অফিস জানিয়েছে, পরে সমস্যা শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় এক গ্রাহকের এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল গড়ে ৯০ ইউনিট। জুনে তা বেড়ে ১০৫ ইউনিট এবং জুলাইয়ে ১৭০ ইউনিটে পৌঁছায়। তার অভিযোগ, নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না; অনেক ক্ষেত্রেই অনুমাননির্ভর বিল করা হয়।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহীতেও অতিরিক্ত বিলের প্রতিবাদে গ্রাহকদের বিক্ষোভ, স্মারকলিপি এবং বিদ্যুৎ অফিসে ভিড় দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য গ্রাহক আগের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল পাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জে ‘নাগরিক অধিকার ফোরাম’-এর উদ্যোগে আয়োজিত গ্রাহক সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, মে মাসের কয়েক দিনের ব্যবহার জুন মাসের সঙ্গে যোগ হওয়ায় অনেক গ্রাহক উচ্চ ট্যারিফ ধাপে চলে গেছেন। সংগঠনটির দাবি, এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে এবং অনেকের বিল ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
একটি বিতরণ সংস্থার বিলিং-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটির কারণে মে মাসে নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন আগেই মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছিল। ফলে জুন মাসের বিলে অতিরিক্ত কয়েক দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় বিল আরও বেড়ে যায়।
জুন থেকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র নতুন ট্যারিফের কারণে বিল কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার কথা নয়। ২০০, ৪০০ কিংবা ৬০০ ইউনিট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিলের বৃদ্ধি সাধারণত ১২ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা।
বিদ্যুৎ বিধিমালা ২০২০ অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক বিলে আপত্তি থাকলে দাবিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দিয়ে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে। ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধিত বিল প্রদান করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জরিমানা বা বিলম্ব মাশুল নেওয়া যাবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ১৬৯৯৯ নম্বরের কেন্দ্রীয় গ্রাহকসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে জুন ও জুলাই মাসে মোট কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি বিল সংশোধন করা হয়েছে এবং সংশোধনের ফলে মোট কত টাকা কমানো হয়েছে- এ সংক্রান্ত কোনো সমন্বিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
দেশজুড়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ বাড়লেও বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, এটি গণহারে নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহারের পরিমাণ, নতুন ট্যারিফ বা রিডিংয়ের সময়ের পরিবর্তনের কারণে বিল বেড়েছে। তবে অনেক গ্রাহক এখনও দাবি করছেন, তাদের প্রকৃত ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল নেই। ফলে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত, ভুল বিল সংশোধন এবং গ্রাহকবান্ধব সেবার দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।


