বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যখন অধিকাংশের চোখ শিরোপার প্রধান দাবিদারদের দিকে, তখন ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে চাপে ফেলে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় চমক হয়ে ওঠা দলটি এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াই।

কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনা স্পষ্ট ফেভারিট হলেও প্রতিপক্ষকে একটুও হালকাভাবে নিচ্ছে না লিওনেল স্কালোনির দল। কারণ, এই বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে বড় দল ও ছোট দলের ব্যবধান মাঠে সবসময় সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে কেপ ভার্দে।

বিশ্বকাপের শুরুতে যাদের নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না, তারাই এখন কোটি ফুটবলপ্রেমীর কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। দলটির খেলোয়াড়রা স্বীকার করেছেন, লিওনেল মেসিকে এতদিন শুধুই টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছেন। এবার সেই কিংবদন্তিকে সরাসরি মোকাবিলা করার সুযোগ পেয়েছেন তারা। এই আবেগ গোটা কেপ ভার্দে জাতির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসও দলের প্রতি অগাধ আস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর বিশ্বাস কেপ ভার্দে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারে। যদিও অনেকের কাছে এটি সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী, তবে কেপ ভার্দের বর্তমান পারফরম্যান্স বিবেচনায় এমন আত্মবিশ্বাস অমূলক নয়।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা জানে, এই ম্যাচ শুধুমাত্র একটি নকআউট লড়াই নয়; এটি সম্ভাব্য এক বড় ফাঁদও হতে পারে। কারণ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে চমকের গল্প নতুন নয়। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হেরে শুরু করেও আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই স্কালোনির শিষ্যরা বুঝতে পারছেন, কোনো প্রতিপক্ষকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

বিশেষ করে কেপ ভার্দে যেভাবে সংগঠিত ফুটবল খেলছে, তাতে তাদের বিরুদ্ধে গোল বের করাও সহজ হবে না। স্পেনের মতো দল যেখানে গোল করতে পারেনি, উরুগুয়েও যেখানে হোঁচট খেয়েছে, সেখানে আর্জেন্টিনাকেও নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।

তবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা অবশ্যই লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের আগে যার খেলা নিয়েই ছিল সংশয়, সেই মেসি এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার। প্রথম তিন ম্যাচেই ছয় গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে তিনিই সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।

কেপ ভার্দের কোচও জানিয়েছেন, মেসিকে থামানোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, মেসিকে কীভাবে খেলেন তা সবাই জানলেও তাকে থামানো সবসময় সম্ভব হয় না। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের সৃজনশীলতা, গতি এবং নিখুঁত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

আর্জেন্টিনার একাদশ নিয়েও রয়েছে কিছু কৌতূহল। জর্দানের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে বেশ কয়েকজন রিজার্ভ খেলোয়াড়কে সুযোগ দিয়েছিলেন স্কালোনি। তবে নকআউট পর্বে তিনি আবার মূল শক্তির দলকেই ফিরিয়ে আনবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফিট হয়ে ওঠা ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, লাউতারো মার্তিনেস ও হুলিয়ান আলভারেসদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ম্যাচের আগ মুহূর্তেই নেওয়া হবে।

শক্তির বিচারে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আত্মবিশ্বাস ও দলগত সংহতি। তারা প্রমাণ করেছে যে শুধুমাত্র রক্ষণ নয়, পাল্টা আক্রমণেও বিপজ্জনক হতে পারে। উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের লড়াই সেই বার্তাই দিয়েছে।

এ কারণে আর্জেন্টিনা এই ম্যাচকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। স্কালোনি ও তার কোচিং স্টাফ প্রতিপক্ষের প্রতিটি ম্যাচ বিশ্লেষণ করেছেন এবং খেলোয়াড়দেরও সতর্ক করে দিয়েছেন যেন কোনোভাবেই আত্মতুষ্টি না আসে। কারণ, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একটি ভুলই স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মায়ামির মাঠে তাই এটি শুধু ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই নয়; এটি অভিজ্ঞতা বনাম স্বপ্ন, ঐতিহ্য বনাম রূপকথারও সংঘর্ষ। কেপ ভার্দে কি আরেকটি বিস্ময় উপহার দেবে, নাকি মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা তাদের রূপকথার ইতি টেনে শিরোপার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে- সেই উত্তর মিলবে বহুল প্রতীক্ষিত এই মহারণে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version