সরকার বদলালেই বদলে যায় পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস-সংস্কৃতির বয়ান- কখনও লেখা বাদ, কখনও নতুন কনটেন্ট; প্রশ্ন উঠছে স্থায়ী ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাক্রম নিয়ে

বাংলাদেশে সরকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তনের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। সময়ের সঙ্গে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন, ভুলত্রুটি সংশোধন কিংবা নতুন জ্ঞান সংযোজন স্বাভাবিক হলেও মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

এক প্রজন্ম যে ইতিহাস ও সংস্কৃতি পড়ে বেড়ে উঠেছে, পরবর্তী প্রজন্ম অনেক ক্ষেত্রে পড়ছে তার পরিবর্তিত সংস্করণ। ফলে একই দেশের একই ইতিহাস সম্পর্কে প্রজন্মভেদে ভিন্ন ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন- বারবার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কি এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষার’ মধ্যে রাখা হচ্ছে?

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের পর পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের ধারাবাহিকতাও জোরদার হয়।

২০১৭ সালে বড় ধরনের পরিবর্তন

২০১৭ সালে বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘সাহিত্য সংকলন’ থেকে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’, জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্রের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহের ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ বাদ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে যুক্ত করা হয় শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হামদ’, আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর-ফারুক’।

সে সময় হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবির প্রেক্ষাপটও আলোচনায় আসে। তাদের দাবির মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী ভাবধারা প্রতিষ্ঠা এবং পাঠ্যসূচি থেকে ‘ইসলামবিরোধী’ বিষয় বাদ দেওয়ার কথা ছিল। পাঠ্যবইয়ের লেখা বাদ-সংযোজনকে কেন্দ্র করে তখন ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

নতুন শিক্ষাক্রমেও বিতর্ক

২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের পরিবর্তে ২০২৩ সালে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের বই চালু করা হয়। নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর বইয়ের বিষয়বস্তু, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৪৮টি বই পর্যালোচনা করে এনসিটিবি ৪০০টির বেশি সংশোধনী দেয়। একই সময়ে ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বই প্রত্যাহার এবং বিজ্ঞান বইয়ের বিবর্তনবাদ-সংক্রান্ত কনটেন্ট নিয়েও বিতর্ক হয়।

২০২৪ সালে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ে আরও ১৪৭টি ভুল সংশোধন করা হয়। একই বছর সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ‘শরীফার গল্প’ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। পরে গল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০২৫ সালে একসঙ্গে বদলে যায় ৪৪১ বই

২০২৪ সালের কথিত জঙ্গি আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

৪১ জন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ৪৪১টি পাঠ্যবই পরিবর্তন করা হয়। বিভিন্ন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও অন্যান্য লেখা বাদ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা, গল্প, কবিতা, ছবি ও গ্রাফিতিও বিভিন্ন বইয়ে স্থান পায়। এনসিটিবির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মাসের মধ্যে এসব বই পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও বদল

২০২৫ সালের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও অবদানসংক্রান্ত বিভিন্ন লেখা, কবিতা ও গদ্য বাদ বা পরিবর্তন করা হয়। একই সঙ্গে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ পরিচয়ের ব্যবহারও কমানো হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনাতেও পরিবর্তন আসে। নতুন বর্ণনায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তার ঘোষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

এ পরিবর্তনের পক্ষে ‘অতিরঞ্জিত’ কিংবা ‘প্রমাণভিত্তিক নয়’ এমন তথ্য বাদ দেওয়ার যুক্তি দেওয়া হলেও এ নিয়ে ইতিহাসের উপস্থাপনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। একই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন কনটেন্টেও পরিবর্তন আসে।

২০২৬ সালেও থামেনি পরিবর্তন

এক বছর পর ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মাধ্যমিক স্তরের ৯৯টি বই পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। প্রাথমিক স্তরের আরও ৩৬টি বই পরিবর্তনের কাজও নেওয়া হয়েছে। এনসিটিবি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের তালিকাও প্রকাশ করেছে।

এ সময় ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে কথিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দিয়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের বিষয় যুক্ত করার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়া ইতিহাসের উপস্থাপনায় বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

২০২৭ সালেও আসছে নতুন পরিবর্তন

পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের বইয়েও মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উপস্থাপনায় আরও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্সের বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বিভিন্ন বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের কথিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, ঘটনাপ্রবাহ, হতাহত, শহীদদের আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও বিভিন্ন বইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে- কেন এত ঘন ঘন বদল?

পাঠ্যবই পরিবর্তনের সব কারণ এক নয়। শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন, নতুন জ্ঞান সংযোজন, ভুলত্রুটি সংশোধন কিংবা সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে বই পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতির মতো বিষয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ঘন ঘন বদলালে প্রশ্ন ওঠে- পাঠ্যবই প্রণয়নের আগে গবেষণা, সম্পাদনা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল?

কারণ, একটি বই শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানোর পর যদি অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার বড় ধরনের সংশোধন করতে হয়, তাহলে শুধু শিক্ষার্থী নয়- শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

শিক্ষার্থীরাই কি সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী?

সময় ও জ্ঞানের পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবই হালনাগাদ করা প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের মৌলিক বয়ান দ্রুত বদলাতে থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একই শ্রেণিতে ভিন্ন সময়ে পড়া দুই শিক্ষার্থীর কাছে মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক ইতিহাস কিংবা সাহিত্য সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য থাকতে পারে। এতে প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানগত পার্থক্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রতি আস্থার সংকটও দেখা দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ।

শিক্ষাবিদ মলয় ভৌমিকের মতে, বারবার পাঠ্যবই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক সময় যথেচ্ছ বা উদ্দেশ্যমূলক পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। তার ভাষায়, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের কয়েক বছর পরপর নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ফেললে তারা এক ধরনের ‘গিনিপিগে’ পরিণত হয়।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরীও বারবার পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, সময়, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবই পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে পরিবর্তন যখন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে অতিমাত্রায় যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

গবেষণাভিত্তিক স্থায়ী কাঠামোর দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গয়েনের মতে, ঘন ঘন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা একটি পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই নতুন পদ্ধতির মুখোমুখি হয়। এতে বিশেষ করে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হকও ২০১৭ সালের পাঠ্যবই পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, সে সময় বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে লেখা বাদ দেওয়া ও নতুন লেখা যুক্ত করা হয়েছিল, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

শিক্ষাবিদদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট- পাঠ্যবই পরিবর্তন নিজেই সমস্যা নয়। সময়ের সঙ্গে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সমাজের পরিবর্তন ঘটলে পাঠ্যবইও হালনাগাদ করতে হবে। কিন্তু ইতিহাস ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর উপস্থাপন যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বারবার বদলে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্থায়ী, নির্ভরযোগ্য ও গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান কাঠামো তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন লেখা বাদ গেল’ বা ‘কোন লেখা যুক্ত হলো’- এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাঠ কি রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে উঠে গবেষণা, প্রমাণ ও শিক্ষাবিজ্ঞানের ভিত্তিতে স্থায়ীভাবে নির্ধারিত হবে? নাকি প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নতুন প্রজন্ম আবারও নতুন ইতিহাসের পাঠ নেবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপিত হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version