নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসীতে গাজী টায়ারস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নিখোঁজ ১৮২ জনের কোনো সন্ধান মেলেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনদের অনেকেই আর প্রিয় মানুষটি জীবিত ফিরে আসার আশা করছেন না। এখন তাদের একটাই দাবি- স্বজনদের মৃত্যুর বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হোক এবং উদ্ধার হওয়া হাড়গোড়ের ডিএনএ পরীক্ষা করে পরিচয় শনাক্ত করা হোক।
২০২৪ সালের আগস্টে কথিত ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় গাজী টায়ারস কারখানায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ২৫ আগস্ট রাতে দ্বিতীয় দফায় লুটপাটের পর কারখানাটিতে আগুন লাগানো হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট প্রায় ২২ ঘণ্টা কাজ করে। পুরোপুরি আগুন নেভাতে কয়েক দিন সময় লাগে।
অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনেরা একের পর এক প্রিয়জনের খোঁজে কারখানার সামনে ভিড় করতে থাকেন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহ করা হলে বিভিন্ন তালিকা সমন্বয় করে মোট ১৮২ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। পরে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়।
তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও নিখোঁজদের পরিণতি নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকাভুক্ত ১৮২ জনের কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের ধারণা, ভয়াবহ আগুনে তারা মারা গিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু সরকারি বা আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের কয়েক দিন পর স্বজনেরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে কয়েক খণ্ড হাড় উদ্ধার করেছিলেন। সেগুলো পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এসব হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে পরিবারের সদস্যদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কারখানা থেকে উদ্ধার হওয়া হাড়গুলোর মধ্যে তাদের স্বজনদের দেহাবশেষ আছে কি না। ডিএনএ পরীক্ষা হলে অন্তত নিখোঁজদের কয়েকজনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দুই বছর ধরে অপেক্ষা করতে করতে নিখোঁজদের অনেক স্বজন এখন ধরে নিয়েছেন, তাদের প্রিয় মানুষ আর বেঁচে নেই। কিন্তু মৃত্যুর সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মৃত্যুসনদ না থাকায় অনেক পরিবার ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র তৈরি করতে পারছে না। কারও সন্তানের জন্মনিবন্ধন আটকে আছে, আবার কারও ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তির নামে থাকা ঋণ বা অন্যান্য আর্থিক দায়-দায়িত্বও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়লেও সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নিখোঁজদের পরিবারের কাছে এখন আর বড় কোনো প্রত্যাশা নেই। তারা চান, অন্তত তাদের স্বজনের শেষ পরিণতি নিশ্চিতভাবে জানানো হোক। কেউ জীবিত থাকলে তাকে খুঁজে বের করা এবং মারা গিয়ে থাকলে মরদেহ বা দেহাবশেষ শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবি তাদের।
জেলা প্রশাসনের তদন্তে ১৮২ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য উঠে এলেও পরবর্তী সময়ে কেন উদ্ধার অভিযান, ফরেনসিক পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন থেমে আছে- এ প্রশ্নও উঠেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজদের তালিকা ধরে অনুসন্ধান চালানো হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। কারখানা থেকে উদ্ধার হওয়া হাড়গুলো ফরেনসিক বিভাগের কাছে রয়েছে বলে জানানো হলেও ডিএনএ পরীক্ষা করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে নির্দেশনা না পাওয়ায় পরবর্তী কার্যক্রম এগোয়নি।
এদিকে, কারখানা কর্তৃপক্ষ ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা করলেও নিখোঁজ ১৮২ জনের বিষয়ে আলাদা কোনো মামলা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে নিখোঁজদের পরিণতি নির্ধারণের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
গাজী টায়ারসের পোড়া ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়াবহ ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে। দেয়ালে আগুনের কালো দাগ, ধসে পড়া কাঠামো আর ভেতরে পড়ে থাকা অজ্ঞাত হাড়গোড় যেন দুই বছর আগের সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নিখোঁজ ১৮২ জনের পরিবারের কাছে এই দুই বছর কেবল অপেক্ষার সময় নয়; এটি অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণার দীর্ঘ অধ্যায়। স্বজনরা বলছেন, তারা এখন আর শুধু প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশায় নেই। তারা চান সত্যটা জানতে।


