বিশ্বকাপ যত শেষের দিকে এগোচ্ছে, ততই জমে উঠছে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গোল্ডেন বুটের দৌড়, যেখানে ফুটবল বিশ্বের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে একে অপরকে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তবে এই দ্বৈরথের আড়ালে নীরবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ডও।

বর্তমান আসরে সাতটি করে গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মেসি ও এমবাপ্পে। এক ম্যাচে একজন এগিয়ে যাচ্ছেন, পরের ম্যাচেই অন্যজন সমতা ফিরিয়ে আনছেন। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াই এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাখ্যানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির জন্য এই লড়াইয়ের গুরুত্ব অন্যরকম। ক্যারিয়ারে রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর, একাধিক আন্তর্জাতিক ও ক্লাব শিরোপা এবং দুইবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতলেও বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান এখনও তাঁর অধরা। ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি যেন শেষ বিশ্বকাপ মিশনে সেই অপূর্ণতাই পূরণ করতে বদ্ধপরিকর।

টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নিজের মিশনের ঘোষণা দেন মেসি। এরপর গ্রুপ পর্বে আরও তিন গোল এবং শেষ ষোলোতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে তিনি নিজেকে গোল্ডেন বুটের প্রধান দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছেন তিনি।

তবে মেসির স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। গত বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী এই ফরোয়ার্ড আবারও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। সেনেগাল ও ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল, শেষ ষোলোতে আরও দুই গোল এবং প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি গোল করে তিনি সাত গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন।

প্যারাগুয়ের বিপক্ষে করা সেই গোলটি ছিল বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ১৯তম গোল। ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ২০ গোলের মালিক মেসির রেকর্ড থেকেও মাত্র এক গোল দূরে অবস্থান করছেন ফরাসি সুপারস্টার। গোলসংখ্যার পাশাপাশি অ্যাসিস্টের হিসাবেও বর্তমানে মেসির চেয়ে এগিয়ে আছেন এমবাপ্পে, যা টাইব্রেকারে তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

তবে গোল্ডেন বুটের লড়াইকে শুধুমাত্র মেসি-এমবাপ্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবার সুযোগ নেই। পাঁচ গোল করে তাদের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড।

২০১৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী কেইন এবারের আসরে আবারও নিজের পুরোনো রূপে ফিরেছেন। ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠা এই স্ট্রাইকার এখন পর্যন্ত দলের আট গোলের মধ্যে পাঁচটিই করেছেন। নকআউট পর্বে তাঁর ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে হঠাৎ করেই সমীকরণ বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে নরওয়ের ইতিহাস গড়ার অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আর্লিং হালান্ড। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকা। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে শেষ ষোলো-প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই গোল করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে জোড়া গোল করে হালান্ড বিশ্বকাপের অন্যতম শিরোনাম হয়ে উঠেছেন। পাঁচ গোল নিয়ে তিনি এখন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। নরওয়ে যদি আরও এক বা দুই ধাপ এগোতে পারে, তাহলে মেসি-এমবাপ্পেকে টপকে যাওয়ার বাস্তব সুযোগও তৈরি হবে তাঁর সামনে।

গোল্ডেন বুট নির্ধারণের নিয়মও এবার বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করেছে। টুর্নামেন্ট শেষে একাধিক ফুটবলারের গোলসংখ্যা সমান হলে প্রথমে বিবেচনা করা হবে অ্যাসিস্ট। এরপরও সমতা থাকলে কম সময় মাঠে খেলা ফুটবলারকে এগিয়ে রাখা হবে। ফলে প্রতিটি গোলের পাশাপাশি প্রতিটি অ্যাসিস্টও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত কোনো ফুটবলার দুবার গোল্ডেন বুট জিততে পারেননি। ফলে এমবাপ্পে ও কেইনের সামনে রয়েছে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। অন্যদিকে মেসি চাইবেন ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণ অধ্যায়টি পূরণ করতে। আর হালান্ড স্বপ্ন দেখছেন প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট জয়ের।


শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বুট উঠবে কার হাতে-মেসির, এমবাপ্পের, কেইনের নাকি হালান্ডের? সেই উত্তর মিলবে ২০ জুলাইয়ের ফাইনালের পর। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিশ্বকাপের শেষ দিন পর্যন্ত এই লড়াই থাকবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর একটি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version