তীব্র গ্যাস সংকটে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল। গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে একের পর এক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মাধবদী, নরসিংদী সদর ও আশপাশের এলাকার ডাইং, প্রিন্টিং, সাইজিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানায় পড়ে থাকা কেমিক্যাল মিশ্রিত ও পানিতে ভেজা কাপড় পচে নষ্ট হচ্ছে। শিল্পমালিকদের হিসাবে, গত এক মাসে শুধু কাপড় নষ্ট হয়েই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
গ্যাস সংকটের কারণে নরসিংদীতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুরো জেলায় তিন শতাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু মালিকরাই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন না, কর্মহীন হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার শ্রমিকও।
নরসিংদীতে আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম ছিল। তখন কোনোভাবে পালাক্রমে কারখানা চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
স্বাভাবিক সময়ে শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস প্রয়োজন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা নেমে ২ থেকে ৪ পিএসআইয়ে দাঁড়ায়। অনেক এলাকায় আবার চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন মেশিন চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে নরসিংদীর শতাধিক ছোট-বড় টেক্সটাইল কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি কারখানায় প্রায় ২০ দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।
গ্যাস না থাকায় ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা কাপড় আটকে যাচ্ছে। কেমিক্যাল ও পানিতে ভেজা কাপড় দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় সেগুলোতে পচন ধরছে। শিল্পমালিকদের হিসাবে, প্রায় এক কোটি গজ কাপড় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
একটি কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ পুরোপুরি শূন্যের কাছাকাছি থাকায় জেনারেটর ও বয়লার চালানো সম্ভব হয়নি। এতে বিপুল পরিমাণ কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে। এসব কাপড়ের একটি অংশ বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণের চাপও তৈরি হতে পারে।
কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ নেই। কেউ কেউ কারখানায় এসে বসে থাকছেন, আবার কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। কিছু কারখানায় উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকদের ব্যস্ত রাখতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করানো হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদনই বন্ধ থাকবে না; শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এতে অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর কারণে স্থানীয় শিল্পকারখানার গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। সার উৎপাদন বাড়াতে গ্যাসের একটি অংশ সেখানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন।
অন্যদিকে তিতাস গ্যাসের নরসিংদী আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব শুধু শিল্পকারখানায় নয়, বাসাবাড়ি ও পরিবহন খাতেও পড়েছে।
নরসিংদী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্রশিল্প এলাকা। দেশের কাপড়ের চাহিদার বড় একটি অংশ এই অঞ্চলের কারখানাগুলো পূরণ করে। ফলে এখানকার উৎপাদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে স্থানীয় বাজারে কাপড়ের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পমালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক সংকট হিসেবে দ্রুত সমাধান করা না গেলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে। একই সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায় তৈরি পণ্য ও কাঁচামাল নষ্ট হওয়ায় উদ্যোক্তাদের লোকসান আরও বাড়বে।
গ্যাস সংকটের কারণে ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো দ্রুত সচল করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন শিল্পমালিকরা। তাদের দাবি, কোন সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট সময়সীমা দিতে হবে।


