দেশের সার উৎপাদনব্যবস্থার চিত্র এখন সরকারের জ্বালানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার ছয়টিই বন্ধ। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও কাঁচামাল নেই, আবার কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটিতে উৎপাদন থেমে আছে। ফলে হাজার হাজার টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কারখানাগুলো পড়ে আছে অলস।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই সংকটের সময়ই সামনে আমন মৌসুম। কৃষকের জমিতে সার দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সরকার অবশ্য বলছে, দেশে সারের সংকট নেই এবং আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হবে। কিন্তু সরকারি তথ্যেই যখন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের সারের বর্তমান মজুত মৌসুমের চাহিদার তুলনায় অনেক কম, তখন সেই আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

বিসিআইসির সাতটি কারখানার মধ্যে বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে শুধু ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা। বন্ধ ছয়টি হলো- চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (সিইউএফএল), যমুনা ফার্টিলাইজার (জেএফসিএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার, টিএসপি, ডিএপি ফার্টিলাইজার এবং শাহজালাল ফার্টিলাইজার।

কারখানাগুলোর সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। অর্থাৎ বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা সামনে রেখেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, গ্যাস সংকট ও কাঁচামাল সরবরাহের ব্যর্থতায় দেশের নিজস্ব সার উৎপাদন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সিইউএফএল গত ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের অভাবে বন্ধ। প্রতিদিন সেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। একইভাবে গ্যাস না পাওয়ায় ফেব্রুয়ারি থেকেই বন্ধ যমুনা সার কারখানা, যেখানে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব।

আশুগঞ্জ সার কারখানাও গত বছরের মার্চ থেকে গ্যাসের অভাবে বন্ধ। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা এই কারখানাটি বন্ধ থাকায় মাসে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, কাঁচামাল সংকটে গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ টিএসপি কারখানা। সেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টন সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ফসফরিক অ্যাসিডের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ২৮ জুন থেকে বন্ধ ডিএপি কারখানার উৎপাদনও।

শাহজালাল সার কারখানাটিও সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, শিগগিরই কারখানাটি চালু হতে পারে।

সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট- দেশের নিজস্ব সার উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরও সমস্যার কার্যকর সমাধান না হওয়ায় এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি দিয়ে সাময়িক ঘাটতি মেটানো গেলেও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা পড়ে রেখে একটি কৃষিপ্রধান দেশ কতদিন আমদানিনির্ভর থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে সারের সংকট নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, আসন্ন রবি মৌসুমের চাহিদার তুলনায় বর্তমান মজুত অনেক কম।

দেশে ইউরিয়া মজুত রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন, যেখানে রবি মৌসুমে প্রয়োজন ১৩ লাখ ২৬ হাজার টন। ডিএপি মজুত ৩ লাখ ৫২ হাজার টন, চাহিদা প্রায় ৯ লাখ ৮৮ হাজার টন। টিএসপি মজুত ৩ লাখ ৬৮ হাজার টন, চাহিদা ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। আর এমওপি মজুত মাত্র ১ লাখ ৮১ হাজার টন, যেখানে চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ৯৮ হাজার টন।

অর্থাৎ এখনো বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হবে। সরকার বলছে, কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সার আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আমদানি ব্যবস্থাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সার কারখানা বন্ধের পেছনে গ্যাস সংকট এখন সবচেয়ে বড় কারণ। একই সময়ে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতও গ্যাসের তীব্র সংকটে ভুগছে। এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি, টার্মিনাল সংকট, কার্গো সময়মতো না আসা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো একাধিক সমস্যা একসঙ্গে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।

শুধু আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলো দ্রুত সচল করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস ও কাঁচামালের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষায়, একসময় দেশের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন করতে পারত বিসিআইসি। এখন নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশে।

সরকারি দপ্তরে সারের পর্যাপ্ত মজুতের দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। রংপুরের কৃষকেরা জানিয়েছেন, কোথাও ডিলারের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। এক ধরনের সার পাওয়া গেলেও অন্যটির জন্য কৃষককে ঘুরতে হচ্ছে বাজারে বাজারে।

আমন মৌসুমে কৃষকের জন্য এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সময়মতো সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর উৎপাদন ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে চালের বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

একদিকে ছয়টি সার কারখানা বন্ধ, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত। এলএনজি কার্গো সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও কমছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং। ফলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবন- সবখানেই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে।

জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সার কারখানা সচল রাখা, কাঁচামাল আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়া- এসবই সরকারের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব।

অথচ বাস্তবতা হলো, সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার ছয়টিই বন্ধ। গ্যাস সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা কাটছে না। শিল্পকারখানা উৎপাদন কমাচ্ছে। আর কৃষক মৌসুমের শুরুতেই সার নিয়ে উদ্বিগ্ন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version