এক মাস ধরে ধুঁকছে শিল্প, কোথাও গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি | ২৪৪ বস্ত্রকল আগেই বন্ধ | বাড়ছে লোকসান, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি
দেশের শিল্পখাত যখন অর্থনীতিকে সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন করে বড় সংকট তৈরি করেছে গ্যাসের অপ্রতুল সরবরাহ। দীর্ঘ এক মাস ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দেশের প্রায় ৬৬০টি বস্ত্রকলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশে। কোথাও আবার গ্যাস না থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ।
শিল্পমালিকদের অভিযোগ, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলো চাইলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। প্রশ্ন উঠছে- দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি ও কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্পকে এভাবে জ্বালানি সংকটে ফেলে রাখার দায় নেবে কে?
গাজীপুরের ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে পাঁচটি ইউনিটে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন হয়। কিন্তু এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে।
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত জেনারেটরের সাহায্য নেওয়া হলেও তাতে উৎপাদন স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এক মাসেই প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও তৈরি হয়েছে আর্থিক চাপ।
অর্থাৎ গ্যাসের সংকট এখন শুধু কারখানার মেশিন বন্ধ রাখার সমস্যা নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে শ্রমিকের আয়, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণ এবং দেশের অর্থনীতি।
গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি বস্ত্রকলে গ্যাসের চাপ এখনো ২ পিএসআইয়ের নিচে। ফলে কারখানাটি তার উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। আবার একই এলাকায় কোনো কোনো কারখানায় চাপ ৭-৮ পিএসআই পর্যন্ত ওঠায় উৎপাদন ৭০-৭৫ শতাংশে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এতে স্পষ্ট, সংকট শুধু গ্যাসের পরিমাণে নয়- সরবরাহের স্থিতিশীলতা ও ব্যবস্থাপনাতেও বড় সমস্যা রয়েছে।
নরসিংদীর সাটিরপাড়ার ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস গ্যাসের অভাবে টানা ২২ দিন বন্ধ ছিল। পরে উৎপাদন শুরু হলেও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ এত কম ছিল যে শুধু রাতের দিকে সীমিত উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক শিল্পপার্কের এমএস ডাইং প্রিন্টিং অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১১০ টন কাপড় ডাইং করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কারখানাটি এখন সেই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- একটি শিল্পনির্ভর দেশের কারখানাগুলোকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
গ্যাসের সংকট নতুন নয়। এলএনজি সরবরাহে সাম্প্রতিক বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে ঠিকই, কিন্তু শিল্পমালিকদের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহের অভাব।
কারখানার মালিকরা আগে থেকেই জানেন না পরদিন পর্যাপ্ত গ্যাস পাবেন কি না। অথচ বিদেশি ক্রেতাকে পণ্য সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারিত। ফলে একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে ক্রয়াদেশ সময়মতো সরবরাহের চাপ- দুই দিক থেকেই উদ্যোক্তারা চাপে পড়ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গ্যাসসংকটে নতুন করে ৬৬০টি বস্ত্রকল যখন বিপর্যস্ত, তখন বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকেই ২৪৪টি বস্ত্রকল বন্ধ রয়েছে।
অর্থাৎ যে শিল্পখাতের ওপর দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বড় একটি অংশ নির্ভরশীল, সেই খাতের একটি বড় অংশ আগে থেকেই সংকটে। এর মধ্যে আবার নতুন করে গ্যাসসংকট উৎপাদনকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু বস্ত্রকল নয়, এর প্রভাব পড়বে সুতা- কাপড়- ডাইং- ফিনিশিং- তৈরি পোশাক- রপ্তানি- পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।
গ্যাসের সংকট যে শুধু বস্ত্রকলেই সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ তৈরি পোশাক খাতেও রয়েছে। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলমান গ্যাস সংকটে পোশাকশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
ফলে একটি শিল্পের জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতেও চাপ তৈরি করছে।
গ্যাস না থাকলে কারখানা চালানো যায় না। কিন্তু কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকের ঋণের কিস্তি, কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যয় থেমে থাকে না।
ফলে উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতার নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
দেশের শিল্পখাতের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই- গ্যাস সরবরাহ কবে স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হবে?
শিল্পমালিকদের প্রয়োজন শুধু মাঝে মাঝে গ্যাসের চাপ বাড়ানো নয়; প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য গ্যাস সরবরাহ। কারণ একটি আধুনিক কারখানা একদিন গ্যাস পাবে, পরদিন পাবে না- এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে না।


