চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ, কান্না আর মৃত্যুর মিছিল। একের পর এক দিন পেরিয়ে যাচ্ছিল, আর নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছিল। এমন এক শোকাবহ মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পবিধ্বস্ত মানুষের হৃদয়ে আশার আলো হয়ে ফিরে এসেছে মাত্র তিন বছর বয়সী শিশু ক্লেইবার মোরান।

ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের গভীর অন্ধকার থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে তাকে। যেখানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়, সেখানে ছয় দিন পর ক্লেইবারের বেঁচে থাকা যেন এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা।

বুধবার (১ জুলাই) প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি লা গুয়াইরায় টানা উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় জর্ডানের একটি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল শিশুটির ক্ষীণ অস্তিত্বের সন্ধান পায়। এরপর শুরু হয় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন বাঁচানোর লড়াই।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হৃদয়স্পর্শী ভিডিওতে দেখা যায়, নিঃশ্বাস বন্ধ করে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পথ তৈরি করছেন। কয়েক মুহূর্ত পর ধুলোমাখা ছোট্ট ক্লেইবারকে যখন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসা হয়, তখন উপস্থিত অনেকের চোখে আনন্দ ও আবেগের অশ্রু ঝরে পড়ে। মৃত্যুর স্তূপের মাঝখানে যেন জীবনের এক অনন্য জয়ধ্বনি শোনা যায়।

ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, “এই শিশুর বেঁচে ফেরা পুরো জাতির জন্য আশার প্রতীক। সে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও অলৌকিকতার জন্য অপেক্ষা করা যায়।”

উদ্ধারের পরপরই ক্লেইবারকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল। চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার পরও তার বেঁচে থাকা সত্যিই বিস্ময়কর।

কিন্তু ক্লেইবারের এই অলৌকিক গল্পের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো পরিবারের অশ্রু ও বেদনার কাহিনি। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৯৪৩ জন। আহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এখনও অসংখ্য পরিবার অপেক্ষা করছে কোনো সুখবরের জন্য-হয়তো ধ্বংসস্তূপের নিচে কোথাও এখনও বেঁচে আছেন তাদের প্রিয়জন।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, নেই নিরাপদ আশ্রয় কিংবা পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। শিশুদের কান্না, স্বজন হারানোর আর্তনাদ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন ভেনেজুয়েলার বহু অঞ্চলের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

১৮ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ড্যানিয়েলা আরমাস বলেন, “মানুষের প্রয়োজন অনেক, কিন্তু সহায়তা খুব কম। কখনও কখনও এক টুকরো খাবারের জন্যও মানুষকে লড়াই করতে হচ্ছে।”

এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে।

তবু এই অন্ধকারের মধ্যেও ক্লেইবার মোরানের গল্প যেন নতুন করে আশাবাদ শেখাচ্ছে। ছয় দিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকেও ছোট্ট শিশুটি হার মানেনি জীবনের কাছে। তার উদ্ধার শুধু একটি প্রাণ বাঁচার ঘটনা নয়; এটি হাজারো হতাশ মানুষের কাছে এক বার্তা যতক্ষণ আশা বেঁচে থাকে, ততক্ষণ অলৌকিকতার দরজাও খোলা থাকে।

ধ্বংসস্তূপের স্তূপের ভেতর থেকে উঠে আসা ছোট্ট ক্লেইবার আজ শুধু একটি শিশুর নাম নয়; সে হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলার অদম্য জীবনশক্তি, সাহস এবং আশার প্রতীক।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version