ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে কার্যত বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম। অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ইতোমধ্যে ছয়টি বন্ধ হয়ে গেছে। আরও সাতটি কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। জ্বালানি সরবরাহের এই সংকট অব্যাহত থাকলে এসব কেন্দ্রের কয়েকটিও যেকোনো সময় উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাগজে-কলমে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই- বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এমন দাবি করলেও চট্টগ্রামের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও এক ঘণ্টাও টানা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত।

তীব্র গরমের মধ্যে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।

পিডিবির মঙ্গলবারের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাপ্তাই সোলার ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট, রাউজান-১ ও রাউজান-২-এর দুটি ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্র, টেকনাফ সোলার ২০ মেগাওয়াট এবং ইউনাইটেড পাওয়ারের ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র।

অন্যদিকে আনলিমা এনার্জি লিমিটেড, আনোয়ারা ইউনাইটেড, বারাকা, বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ ও জুডিয়াকসহ সাতটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারি হিসাব ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এত বড় ব্যবধান নিয়ে। পিডিবির হিসাবে চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ রয়েছে। পিক আওয়ারে চাহিদা ১ হাজার ৬৮ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহও একই পরিমাণ। অফ-পিক আওয়ারে চাহিদা ৯৫৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহও সমপরিমাণ বলে দাবি করছে সংস্থাটি।

কিন্তু নগরবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বুধবার কল্পলোক আবাসিক এলাকায় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। কাগজে-কলমে পিডিবি শূন্য মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখালেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।

পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন ধরে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। কারখানাগুলোতে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করা হলেও জ্বালানি সংকট ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তা দিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, গ্যাস সংকটে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। গত ৪ মার্চ থেকে গ্যাসের অভাবে কারখানাটির ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই সার কারখানায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ।

কারখানাটি চালাতে দৈনিক প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন চালু করা যাচ্ছে না। এতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি এক হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ৪ মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা নয়; এটি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, উৎপাদন সক্ষমতাও রয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে কিংবা সক্ষমতার একটি অংশ দিয়ে চালাতে হচ্ছে।

অন্যদিকে সরকারি হিসাবে লোডশেডিং নেই বলে দেখানো হলেও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। ফলে সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে- এটি আগে থেকেই অনুমিত ছিল। এরপরও পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারা, একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শিল্প ও সার উৎপাদনে বিপর্যয় ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারায় সরকারের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version