মহাকাশ থেকে ভারতের সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে নজরদারির সক্ষমতা আরও এক ধাপ বাড়াতে যাচ্ছে ভারত। প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় জিওসিঙ্ক্রোনাস অরবিটে (GEO) স্থাপনের লক্ষ্যে আজ রাতে উৎক্ষেপণ করা হবে ভারতের অত্যাধুনিক ইমেজিং স্যাটেলাইট EOS-05। সফল হলে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নজর রাখার ক্ষেত্রে নতুন সক্ষমতা অর্জন করবে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- ইসরো।

ইসরোর GSLV F17 মিশনের মাধ্যমে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে স্থানীয় সময় ৪ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ৫৫ মিনিটে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। EOS-05, যা Gisat-1A নামেও পরিচিত, জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে কাজ করা ভারতের প্রথম অত্যাধুনিক আর্থ-ইমেজিং স্যাটেলাইট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এর মাধ্যমে ভারতীয় সীমান্ত- বিশেষ করে পাকিস্তান, চীন ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাসহ- গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের ওপর মহাকাশভিত্তিক নজরদারির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে স্যাটেলাইটটির ব্যবহার শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ, আবহাওয়া ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেও এর তথ্য কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

EOS-05-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর কক্ষপথ। সাধারণত ভারতের Cartosat ও RISAT-এর মতো ইমেজিং ও আর্থ-অবজারভেশন স্যাটেলাইটগুলো লো আর্থ অরবিট বা LEO-তে অবস্থান করে। পৃথিবী থেকে কয়েকশ থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার উচ্চতার এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো দ্রুত পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। ফলে নির্দিষ্ট কোনও এলাকার ওপর দিয়ে একবার চলে যাওয়ার পর একই অঞ্চলে আবার ফিরতে সময় লাগে।

কিন্তু GEO কক্ষপথের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় স্যাটেলাইটটি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রদক্ষিণ করায় মাটি থেকে দেখলে এটি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের ওপর প্রায় স্থির বলে মনে হয়।

ফলে একই এলাকার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ চালানো সম্ভব। সীমান্তে হঠাৎ কোনও পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কার্যক্রম, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এই সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের জন্য EOS-05-এর কৌশলগত গুরুত্ব এখানেই। সীমান্তের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোনও এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ চালানো সম্ভব হলে স্থলভিত্তিক ও অন্যান্য স্যাটেলাইটনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে এর তথ্য সমন্বয় করা যেতে পারে।

বিশেষ করে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বিস্তৃত সীমান্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে মহাকাশ থেকে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা ভারতের সামগ্রিক আর্থ-অবজারভেশন অবকাঠামোকে শক্তিশালী করবে।

তবে EOS-05-কে সরাসরি ‘২৪ ঘণ্টার লাইভ ক্যামেরা’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করবে কক্ষপথ, সেন্সর, রেজোলিউশন, আবহাওয়া ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর দীর্ঘক্ষণ নজর রাখার ক্ষেত্রে GEO কক্ষপথের সুবিধা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

EOS-05-এ রয়েছে দুটি মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজার। এর একটি ক্যামেরার স্পেশিয়াল রেজোলিউশন প্রতি পিক্সেলে প্রায় ৪২ মিটার বলে জানানো হয়েছে। জিওস্টেশনারি কক্ষপথে থাকা ইমেজিং স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে এই রেজোলিউশনকে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই সেন্সরগুলোর মাধ্যমে ভূমি, পরিবেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঝড়, দাবানল, বজ্রঝড়সহ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ঘটনাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যেতে পারে।

অর্থাৎ, EOS-05 শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য নয়- ভারতের মহাকাশভিত্তিক আবহাওয়া ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

EOS-05-এর পেছনে রয়েছে ইসরোর একটি পুরোনো ব্যর্থতার ইতিহাস। ২০২১ সালের ১২ আগস্ট GSLV-F10 রকেটের মাধ্যমে Gisat-1 উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে প্রয়োজনীয় ইগনিশন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। ফলে সেই মিশন ব্যর্থ হয়।

উৎক্ষেপণটি সফল হলে Gisat-1-ই জিওস্টেশনারি কক্ষপথ থেকে কাজ করা ভারতের প্রথম আর্থ-ইমেজিং স্যাটেলাইট হতে পারত। সেই অসম্পূর্ণ লক্ষ্য পূরণেই এবার EOS-05-কে সামনে আনা হয়েছে।

প্রায় আট মাসের বিরতির পর শ্রীহরিকোটা থেকে বড় ধরনের উৎক্ষেপণ মিশনে ফিরছে ইসরো। ফলে EOS-05-এর উৎক্ষেপণ শুধু একটি নতুন স্যাটেলাইট পাঠানোর ঘটনা নয়; ভারতের মহাকাশভিত্তিক নজরদারি ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণ সক্ষমতার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মিশন সফল হলে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপর থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে ভারতের হাতে আসবে নতুন এক প্রযুক্তিগত হাতিয়ার। সীমান্ত নজরদারি থেকে শুরু করে কৌশলগত পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা- বহু ক্ষেত্রে এর ডেটা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। মহাকাশে ভারতের ‘আকাশচোখ’ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version