রোজারিওর ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বফুটবলের শীর্ষে; আর্জেন্টিনার জার্সিতে দীর্ঘ পথচলার ইতি টানার ঘোষণা বিশ্বকাপজয়ী সর্বকালের সেরা অধিনায়কের

এক টুকরো টিস্যু পেপারে যার বার্সেলোনার সঙ্গে পথচলার সূচনা, সেই লিওনেল মেসিই এবার নিজের হাতে লেখা তিন পাতার চিঠিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানালেন। রোজারিওর ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে উঠে আসা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে যোগ হলো আরও একটি আবেগঘন অধ্যায়।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের হাতে লেখা তিন পাতার একটি চিঠির ছবি প্রকাশ করেন সর্বকালের সেরা মেসি। সেখানে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সির প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা, দেশের মানুষের জন্য সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে জানান, আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের শেষ সময়টি তিনি অনুভব করতে পারছেন।

মেসির ভাষায়, “আমি শপথ করে বলছি, আমি সবসময় আমার সবকিছু দিয়েছি। শুধু শেষ কয়েক বছর নয়, যখন সবকিছু জেতা হয়েছিল, তখনও নয়; আমি সবসময় এই জার্সির জন্য লড়াই করেছি এবং আমার সবকিছু দিয়েছি, তাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং ফুটবলের মাধ্যমে তাদের আর্জেন্টাইন হতে গর্বিত করার জন্য।”

চিঠির শেষদিকে তার উপলব্ধি- “আমি বুঝতে পারছি, এটাই সেই মুহূর্ত।” ভক্তদের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর আবেগ ও বিষণ্নতা।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম মেসির। শৈশবেই তার গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ধরা পড়ে। নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও এর ব্যয় ছিল পরিবারের জন্য বড় চাপ।

তবে বয়সের তুলনায় ছোট শরীরের এই শিশুটির ফুটবল প্রতিভা ছিল অসাধারণ। বল পায়ে তার ড্রিবলিং ও নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় পর্যায়েই নজর কাড়ে। শেষ পর্যন্ত তার প্রতিভার খবর পৌঁছে যায় স্পেনের FC Barcelona-এর কর্মকর্তাদের কাছে।

বার্সেলোনার তৎকালীন পরিচালক কার্লেস রেক্সাস মেসির প্রতিভায় মুগ্ধ হন। ক্লাবটি তার চিকিৎসার ব্যয় বহনের বিষয়ে আগ্রহ দেখালে মেসির পরিবারও সম্মত হয়।

২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর মেসিকে বার্সেলোনায় নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। সেই সময় আনুষ্ঠানিক চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ না থাকায় একটি টিস্যু পেপারে লিখে রাখা হয়েছিল সমঝোতার কথা। পরবর্তীতে ওই ঐতিহাসিক টিস্যু পেপারই মেসির ফুটবলজীবনের অন্যতম স্মারক হয়ে ওঠে।

বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় শুরু হয় মেসির নতুন জীবন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসেন মূল দলে। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও গড়েন একের পর এক রেকর্ড। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।

ক্লাব ফুটবলের সাফল্যের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জার্সিতেও দীর্ঘ সময় ধরে খেলেছেন মেসি। তবে জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। একাধিক ফাইনালে হার, সমালোচনা ও হতাশার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূরণ করেন তিনি।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফাইনালটিও মেসির জন্য হয়ে ওঠে আবেগঘন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মেসিকে দেখা যায় আবেগাপ্লুত অবস্থায়। এর পরেই নিজের হাতে লেখা চিঠিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

কিংবদন্তী মেসির এই সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে তার ভক্তদের মধ্যে নেমে এসেছে বিষণ্নতা। কারণ তার বিদায় মানে শুধু একজন তারকা ফুটবলারের বিদায় নয়; বরং কয়েক দশক ধরে বিশ্বফুটবলকে প্রভাবিত করা একটি যুগের সমাপ্তির সূচনা।

মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রতীকী বিষয়গুলোর একটি হয়ে আছে সেই টিস্যু পেপার। যে কাগজে একসময় তার বার্সেলোনা-যাত্রার সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই হয়ে ওঠে মূল্যবান ঐতিহাসিক স্মারক। ২০২৪ সালে ওই টিস্যু পেপার নিলামে বিক্রি হয় বিপুল অর্থে। আর এবার মেসির নিজের হাতে লেখা তিন পাতার চিঠি যেন সেই গল্পের আরেক প্রান্তকে স্পর্শ করল।

একদিকে টিস্যু পেপারে লেখা হয়েছিল তার নতুন জীবনের সূচনা, অন্যদিকে নিজের হাতে লেখা চিঠিতে তিনি জানালেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের পথচলার শেষের কথা।

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বিশ্বফুটবলের অন্যতম অমর নাম। বয়স বাড়লেও তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব কমেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

সর্বকালের সেরা মেসি মাঠ ছাড়বেন কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তার অধ্যায় শেষ হবে না।

টিস্যু পেপারে শুরু হওয়া যে গল্প একদিন বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়েছিল, তিন পাতার চিঠিতে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তির ঘোষণা এল।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version