তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ নিটওয়্যার ও তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন- বিকেএমইএ। সংগঠনটির দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ক্রয়াদেশ কমিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। এতে রপ্তানি বাণিজ্য ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২৩ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএ কার্যালয়ে গ্যাস সংকট ও এর প্রভাব নিয়ে জরুরি ব্যবসায়ী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাসের অভাবে দেশের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে আগে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
পোশাকশিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং ও বয়লার পরিচালনায় গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিকেএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো সময়মতো পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় কিছু ক্রেতা বাংলাদেশে দেওয়া অর্ডার কমিয়ে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর কারখানায় অর্ডার স্থানান্তরের পথে যাচ্ছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তারা আপাতত বাংলাদেশ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমাচ্ছেন না। বরং অনেক রপ্তানিকারক বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সময়মতো পণ্য সরবরাহের চেষ্টা করছেন।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নিজ প্রতিষ্ঠানের একটি ইউরোপীয় ক্রেতার উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে ওই ক্রেতা প্রতিশ্রুত ক্রয়াদেশের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে।
গ্যাস না থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোথাও ডিজেল, কোথাও ধানের তুষ, আবার কোথাও কাঠ ব্যবহার করে বয়লার চালানো হচ্ছে।
কিন্তু এসব বিকল্প জ্বালানির খরচ গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি। শিল্পোদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানাকে গ্যাসের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি খরচে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কমছে মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও চাপে পড়ছে।
একটি বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা চালাতে গিয়ে তাদের মাসে কয়েক কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তারপরও সময়মতো পণ্য সরবরাহের চেষ্টা করছেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে। ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। পরে টার্মিনাল মেরামত করে চালু করা হলেও পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না থাকায় সরবরাহে ঘাটতি অব্যাহত থাকে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২৩ আগস্ট সন্ধ্যায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সরকারের পক্ষ থেকেও দ্রুত গ্যাস সংকট পুরোপুরি সমাধানের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেও প্রায় দুই বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টেক্সটাইলসহ অন্যান্য পণ্য যুক্ত করলে এ খাতের রপ্তানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ফলে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, আজ গ্যাস সংকটের কারণে যে অর্ডার সাময়িকভাবে কমছে, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা স্থায়ীভাবে অন্য দেশে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে একবার কোনো ক্রেতা বিকল্প সরবরাহকারী তৈরি করে ফেললে সেই অর্ডার পুনরায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।


