নেতৃত্বের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগেরই, বললেন শেখ হাসিনা
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সফল এবং বারবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, দল চাইলে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কোনো সরকার কিংবা কেউই নেওয়ার অধিকার রাখে না বলেও স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ভারতের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং দেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনার বক্তব্য, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দল। দলটির নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দলের নেতাকর্মীদেরই। কথিত কোনো সরকার কিংবা আর কেউই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কেউ নয়। তিনি বলেন, “আমার দল যদি বলে আমি সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াব, তাহলে আমি তা করব।”
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, বিরোধী রাজনীতি, ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া, ২০০১ সালে ক্ষমতা হারানো, ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া, ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে কারাবরণ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনী বিজয়ের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনাকে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল বিজয়ের পর তিনি দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করেন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তার সরকার দেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি, ডিজিটালাইজেশন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের উন্নয়ন পরিবর্তনের কান্ডারী।
আওয়ামী লীগের ইতিহাসও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ম্যান্ডেট এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর দলটি দীর্ঘ সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ নতুন করে সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করে এবং সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ছাড়েননি। নিরাপত্তাকর্মী, দলীয় নেতাকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা তাকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, দেশ ছাড়ার বিষয়টি তিনি আগে থেকে জানতেন না; হেলিকপ্টারে ওঠার পর জানতে পারেন তাঁকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে।
ভারতে অবস্থানকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি বলেও জানান তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূলত দলীয় নেতাকর্মী ও স্বজনদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে চান বলে জানান সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নিয়ে নিজের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনার জবাবেও শেখ হাসিনা বলেন, সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি শুধু সত্য কথা বলতে চেয়েছেন। তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক অংশ।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। জামায়াতের সদস্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার এবং দলটির রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের জোট ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনার ভাষ্য, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেশের জনগণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন তাই কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ইতিহাস নয়; এটি আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আন্দোলন, দীর্ঘ রাষ্ট্রক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জঙ্গী হামলায় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি দীর্ঘ অধ্যায়। তিনি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ়চেতা নেত্রী, সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ হাসিনার সর্বশেষ বক্তব্যটি যেন একটি বিষয়ই নতুন করে সামনে আনল- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই নেবেন।


