আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি কালো দিন নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, সংবিধান ও আইনের শাসনের ওপর নেমে আসা এক ভয়াবহ আঘাতের দিন। সেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু হয় এক অন্ধকার অধ্যায়। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের নির্মমতার চেয়েও পরবর্তী রাষ্ট্রীয় আচরণ অনেক বেশি গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে তার প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার বিচার বন্ধ করে দিতে পারে? কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা আইনের হাত থেকে সুরক্ষা পেতে পারে? আর কীভাবে তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যেই পুনর্বাসিত হতে পারে?
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জারি করেন বহুল আলোচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ যে রাষ্ট্রে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রই হত্যাকারীদের বিচারের পরিবর্তে তাদের জন্য আইনি ঢাল তৈরি করল। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয় এবং একই বছর পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের সামরিক শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে বিচারহীনতা আর কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকল না; তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেও জায়গা করে নিল।
এরপর আসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসনের প্রশ্ন। খুনিদের মধ্য লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল আজিজ পাশা, মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, মেজর বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার রশিদ, মেজর রাশেদ চৌধুরী, মেজর নূর চৌধুরীসহ একাধিক ব্যক্তির বিদেশে অবস্থান এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর নোংরামোর জন্ম দিয়েছে। চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশে তাদের দায়িত্ব পালনের তথ্য ঐতিহাসিক আলোচনায় এসেছে। কূটনৈতিক পদ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক নিয়োগ নয়; এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা ও পরিচয়ের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি না করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োগের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে, এটি কি ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটি সচেতন কূট প্রক্রিয়া?
এই ইতিহাসের আরেকটি ঘৃণ্যতম অধ্যায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে মেজর ফারুক রহমান, মেজর রশিদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, স্মৃতিকথা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে ইতিহাসের এই অংশে আবেগ নয়, প্রমাণই হওয়া উচিত চূড়ান্ত মানদণ্ড। জিয়াউর রহমান সরাসরি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য ও বিচারিক রেকর্ড পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যে মূল্যায়নে জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় খুনে আর জিঘাংসক। কিন্তু এর চেয়েও বড় ও স্পষ্ট প্রশ্ন হলো হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীদের বিচার থেকে দূরে রাখার যে রাষ্ট্রীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার রাজনৈতিক দায় জিয়ার।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্যত বন্ধ ছিল দীর্ঘ ২১ বছর। একটি স্বাধীন দেশের মহান স্থপতি এবং রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর হত্যাকারীদের বিচার চাইতে একটি প্রজন্মকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ফিরে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করলে বিচারিক প্রক্রিয়ার পথ খুলে যায়। এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায় হয় এবং কয়েকজন দণ্ডিত আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। বিদেশে অবস্থানরত দণ্ডিত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টাও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেও ইতিহাসের প্রশ্ন থেকে যায়- একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ২১ বছর কেন লাগবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বুঝতে হয়, ইনডেমনিটি শুধু একটি আইন ছিল না; এটি ছিল একটি রাজনৈতিক অপ-দর্শনের প্রতিফলন।ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধকে বিচার থেকে দূরে রাখার কূ-দর্শন। রাষ্ট্র যখন কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করতে আইন ব্যবহার করে, তখন শুধু একটি মামলার বিচার থেমে যায় না; আইনের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপরাধী যদি রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কারণে বিচার থেকে রেহাই পায়, তাহলে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা যায়, ক্ষমতা থাকলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব।
সেখানেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এটি শুধু একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা শোকের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল একদিনে, কিন্তু সেই হত্যার বিচার বন্ধ রেখে যে অন্ধকার তৈরি করা হয়েছিল, তা কাটাতে লেগেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। ইতিহাসকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা যায়, সত্যকে রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা যায়, দায়মুক্তির আইন বানিয়ে বিচারের পথ বন্ধ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে চিরদিনের জন্য নির্বাক করা যায় না।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, রাজনৈতিক সরকার আসে এবং যায়; কিন্তু ইতিহাস থেকে যায়। আর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বিচার হলো যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, একদিন সেই রাষ্ট্রকেই তার ব্যর্থতার জবাব দিতে হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তাই শুধু ১৫ আগস্টের শোকগাঁথা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা, আইনের শাসনের বিকল্প কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা হতে পারে না, আর দায়মুক্তির কোনো আইন ইতিহাসের আদালতে চিরস্থায়ী ঢাল হয়ে থাকতে পারে না। বিনম্র চিত্তে বাংলাদেশের মহান স্থপতিকে স্বরণ করি আর ধিক্কার জানাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের আর তার পেছনের কুশীলব মোশতাক এবং জিয়াউর রহমানকে।।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


