দেশের শিল্প খাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। কার্যাদেশের ঘাটতি, মালিকদের আর্থিক দুরবস্থা, শ্রম অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কর্মহীন হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক, আর শিল্পাঞ্চলগুলোতে বেড়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট শিল্প খাতের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের প্রধান শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড ও ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আর্থিক সংকটের কারণে গত ১৬ জুন থেকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার পর প্রতিষ্ঠান দুটি চূড়ান্তভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এ দুই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।

তথ্য বলছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরের শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বাকি কারখানাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সদস্য ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্য ৩৫টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য ৮টি এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটির (বেপজা) আওতাধীন ১৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে উৎপাদন ও কার্যাদেশ কমে যাওয়ার কারণে ৭৯টি কারখানা থেকে ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর আগে দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপও তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করে।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস, আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে পড়া, ব্যাংকিং জটিলতা, কাঁচামালের সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব শিল্প খাতকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক বড় শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম চালু করেছে। পাশাপাশি কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠন করা হয়েছে। বন্ধ বা আংশিকভাবে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর তথ্য সংগ্রহেও উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের কঠোর শর্তের কারণে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা এসব সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না। গত ১৪ জুন বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, সব বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নেই, আবার অনেকের ঋণসংক্রান্ত সিআইবি প্রতিবেদনও সন্তোষজনক নয়। তিনি জানান, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, কার্যাদেশ কমে যাওয়া, কিছু প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারাও কারখানা বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদদোজা চৌধুরী জানান, প্রায় ২০০টি বন্ধ এবং ১২৩টি আংশিকভাবে বন্ধ কারখানা সরকারের ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাঁর মতে, যেসব কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হলে দ্রুত কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, জামানতসংক্রান্ত কঠোর শর্তের কারণে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সিএমএসএমই খাতের জন্য ৭ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ন্যূনতম ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বিজিএমইএ জানিয়েছে, আর্থিক সহায়তা নিতে আগ্রহী কারখানাগুলো পরিদর্শনের জন্য দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ পাঠানো হবে।

শিল্প খাতের এই ক্রমবর্ধমান সংকট শুধু উদ্যোক্তাদের নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version