দীর্ঘ প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পুনরায় চালু হচ্ছে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা। আগামী ২৮ জুন থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনার ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (আইভ্যাক)-এ পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন।
ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে ভ্রমণের সুযোগ আবারও উন্মুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে ভিসা পেতে আবেদনকারীদের নির্ধারিত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে আগে থেকেই সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে প্রথমে ভারতের অনলাইন ভিসা পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে ‘রেগুলার ভিসা অ্যাপ্লিকেশন’ অপশন নির্বাচন করে দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবং ভিসার ধরন হিসেবে ট্যুরিস্ট ভিসা বেছে নিতে হবে।
এরপর আবেদনকারীকে পাসপোর্ট অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথ্য, পাসপোর্টের বিস্তারিত বিবরণ এবং ভ্রমণ-সংক্রান্ত তথ্য সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করতে হবে। আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর একটি ওয়েব ফাইল নম্বর বা অ্যাপ্লিকেশন আইডি পাওয়া যাবে, যা পরবর্তী সব কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
একইসঙ্গে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের সাম্প্রতিক তোলা একটি ডিজিটাল ছবি আপলোড করে আবেদনপত্র প্রিন্ট করতে হবে এবং নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করতে হবে।
ভিসা আবেদনের সময় পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস থাকতে হবে এবং অন্তত দুটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে। পুরোনো পাসপোর্ট থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে।
এছাড়া প্রয়োজন হবে—
সাম্প্রতিক তোলা রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি
জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্মনিবন্ধনের কপি
বর্তমান ঠিকানার প্রমাণপত্র
পেশাভিত্তিক প্রয়োজনীয় নথি
চাকরিজীবীদের জন্য অফিসের নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) বা প্রত্যয়নপত্র, ব্যবসায়ীদের জন্য হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র বা বোনাফাইড সনদ জমা দিতে হবে।
ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পেতে আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হবে। এজন্য গত ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেওয়া যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে পাসপোর্টে কমপক্ষে ১৫০ মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অ্যান্ডোর্সমেন্ট থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের কপিও আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
অনলাইন আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর আইভ্যাকের নির্ধারিত পেমেন্ট পোর্টালের মাধ্যমে প্রসেসিং ফি পরিশোধ করতে হবে। এরপর আইভ্যাক বাংলাদেশ ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট আগের দিন সন্ধ্যা ৬টায় উন্মুক্ত করা হয়। তবে আবেদনকারীকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে সাইন-আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিনে আবেদনকারীকে প্রিন্ট করা আবেদনপত্র, বৈধ পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইভ্যাক কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে।
সাধারণত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে আবেদনপত্র গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিক যাচাই শেষে আবেদনকারীকে একটি টোকেন দেওয়া হবে। টোকেন নম্বর অনুযায়ী নির্ধারিত কাউন্টারে ফাইল জমা দিতে হবে।
ভিসা আবেদন দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত করতে নথিপত্র নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফাইলের শুরুতে থাকবে—
১. প্রিন্ট করা অনলাইন আবেদনপত্র
২. আইভ্যাক ফি প্রদানের রসিদ
৩. বর্তমান ও পুরোনো পাসপোর্ট
৪. পাসপোর্টের তথ্যপাতার ফটোকপি
৫. জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদের কপি
৬. বর্তমান ঠিকানার প্রমাণপত্র
৭. পেশাগত নথিপত্র
৮. আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ
কাউন্টার কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করার পর আবেদনকারীর ডিজিটাল ছবি, আঙুলের ছাপ এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান গ্রহণ করবেন। প্রক্রিয়া শেষে একটি রসিদ বা ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে।
পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় এই রসিদ প্রয়োজন হবে, তাই এটি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে রসিদের নম্বর ব্যবহার করে ভিসার আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে তা অনলাইনে দেখা যাবে।
ভিসা প্রস্তুত হলে আবেদনকারীর মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠানো হবে। এরপর রসিদে উল্লেখিত সময় অনুযায়ী, সাধারণত বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইভ্যাক কেন্দ্র থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করা যাবে।
ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত ন্যূনতম তিন কার্যদিবস সময় লাগে। তবে আবেদনকারীর তথ্য যাচাই, জাতীয়তা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সময় আরও বাড়তে পারে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনলাইন আবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো তথ্য সংশোধনের সুযোগ থাকে না। তাই নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বরসহ সব তথ্য একাধিকবার যাচাই করে আবেদন জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রাপ্ত অ্যাপ্লিকেশন আইডি বা ওয়েব ফাইল নম্বর ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ও ভিসা সংক্রান্ত যেকোনো অনুসন্ধানের জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।
দীর্ঘ বিরতির পর ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় চিকিৎসা, পর্যটন, ব্যবসায়িক সফর এবং পারিবারিক ভ্রমণে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সঠিক নিয়ম অনুসরণ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখলে আবেদন প্রক্রিয়া হবে আরও সহজ ও দ্রুত।


