৫৫% কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমেছে, সময়মতো শিপমেন্টে ব্যর্থ ৮৭%
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক খাত। অথচ দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে সেই শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন- বিকেএমইএর সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমে গেছে। একই সঙ্গে ৮৭ শতাংশ রপ্তানিকারক সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করতে পারেননি।
শিল্প খাতের এই চিত্র শুধু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদেশি ক্রেতার আস্থা, রপ্তানি আয়, ব্যাংকঋণ, শ্রমঘণ্টা এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ঝুঁকি।
বিকেএমইএর জরিপ অনুযায়ী, ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকটের পর বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে এবং ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে যায়।
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশের বেশি কারখানায় উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং প্রায় ৭ শতাংশ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়েছে। একই অনুপাতে কারখানাগুলোতে শ্রমঘণ্টাও নষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন চালু রাখতে খরচ বাড়ছে- ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তৈরি হচ্ছে দ্বিমুখী আর্থিক চাপ।
রপ্তানি ব্যবসায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ৮৭ শতাংশ রপ্তানিকারক সময়মতো শিপমেন্ট দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে বিদেশি ক্রেতাদের ছাড় দিতে হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা মালিক বিদেশি ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ আজকের জ্বালানি সংকট আগামী দিনের রপ্তানি বাজারেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে বিকেএমইএ সতর্ক করেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। আগস্টেও সংগঠনটি জানিয়েছিল, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলো সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন কমে যাওয়া, অর্ডার বাতিল বা কমে যাওয়া এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে কারখানাগুলোর নগদ প্রবাহে। জরিপে প্রায় ১০ জনে ৬ জন রপ্তানিকারক জানিয়েছেন, সংকটের কারণে ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকটটি শুধু পোশাক কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; ব্যাংকিং খাত, শ্রমবাজার, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, এলএনজির মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা ও অন্যান্য কাঠামোগত কারণও রয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে উচ্চ এলএনজি মূল্যের চাপ এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা উঠে এসেছে।
তবে শিল্পমালিকদের বক্তব্য ও জরিপের ফলাফল সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর?
বিকেএমইএ ইতোমধ্যে সংকট মোকাবিলায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, যানবাহনে গ্যাস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিস্থিতি জানানোর দাবি জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার তথ্য সরকারের জ্বালানি ও শিল্প ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। রপ্তানি খাতকে সচল রাখার জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে সাময়িক জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি বাজার হারানোর সংকটে রূপ নিতে পারে- এমন আশঙ্কাই এখন শিল্পমহলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
বিকেএমইএর সক্রিয় সদস্য প্রায় ৮০০টি। জরিপে সংগঠনটির সদস্যভুক্ত প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানিমুখী কারখানার তথ্য নেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ আনুমানিক ১৬০টি কারখানা এই জরিপের আওতায় ছিল। তাই পরিসংখ্যানগুলোকে পুরো নিটওয়্যার খাতের প্রত্যেক কারখানার সরাসরি চিত্র না ধরে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত।
তারপরও ৫৫ শতাংশ অর্ডার বাতিল বা কমে যাওয়া, ৮৭ শতাংশের শিপমেন্ট ব্যর্থতা, ৯২ শতাংশের বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এবং ৮৯ শতাংশের ক্রেতার আস্থা হারানোর আশঙ্কা- এই সমন্বিত চিত্র বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।


