নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বোরনো রাজ্যে একটি বিদ্যালয়ে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় অন্তত ৩৭ শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরীক্ষার সময় সংঘটিত এই হামলা দেশটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হামলার সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (আইএসডব্লিউএপি)-এর সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকালে পরীক্ষা চলাকালে সশস্ত্র হামলাকারীরা বিদ্যালয়টিতে হানা দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই লাসা অঞ্চলটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। হামলার সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন এবং অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটোছুটি করেন।

বার্তাসংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর অন্তত ৩৭ শিক্ষার্থীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেনাবাহিনীর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় এক সেনাসদস্য, এক শিক্ষকসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও একজন শিক্ষক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

স্থানীয় সরকার কাউন্সিলর ইজাগলা ইজাবিলা সাংবাদিকদের কাছে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা সরবরাহ করেছেন। একটি গোয়েন্দা সূত্রও ওই তালিকার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধানে প্রশাসনের তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বোরনো রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লাওয়ান আব্বা ওয়াকিলবে বলেছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে বর্তমানে ২৫ জন ছাত্রী, ১১ জন ছাত্র এবং একজন শিক্ষক আটক রয়েছেন। তবে বিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষসহ আটজনকে ইতোমধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী জিম্মিদের নিরাপদে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে অপহরণ বর্তমানে নাইজেরিয়ার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান কৌশলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনায় শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

নাইজেরিয়ার ইতিহাসে শিক্ষার্থী অপহরণের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে, যখন জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারাম চিবোক শহর থেকে শত শত স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলা সেই ঘটনার পরও দেশটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে অপহরণ ও হামলার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

চলতি বছরের মে মাসেও বোরনো রাজ্যের মুসা গ্রাম থেকে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়েছিল, যাদের অনেকেই এখনও মুক্তি পায়নি। একই সময়ে ওয়ো রাজ্যের তিনটি বিদ্যালয় থেকেও কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়। তুলনামূলক নিরাপদ বলে পরিচিত দক্ষিণ-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় এমন ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

২০০৯ সাল থেকে নাইজেরিয়া সশস্ত্র বিদ্রোহ ও জঙ্গি সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। গত এক দশকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে হামলার সংখ্যা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ এই স্কুল হামলা প্রমাণ করেছে যে দেশটির নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের আশায় উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো দিন গুনছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version