অস্তিত্বহীন ঠিকানায় ‘আইকনিক সোর্সিং’, বন্ধ মোবাইল নম্বর; নদীভাঙন ঠেকাতে ৫২৭ কোটি টাকার প্রকল্প চললেও বালু উত্তোলনের তোড়জোড়
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পদ্মা সেতুর কাছাকাছি পদ্মা নদী থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলনের উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের প্রক্রিয়া এগোলেও সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
আবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড। কিন্তু ওই ঠিকানায় গিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানেন না। এমনকি আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরটিও বর্তমানে বন্ধ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- যে এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেই নদীভাঙন রোধে সরকার ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ ও তলদেশের গঠনে পরিবর্তন ঘটতে পারে, বাড়তে পারে নদীভাঙনের ঝুঁকি এবং হুমকির মুখে পড়তে পারে পদ্মা সেতুর নদীশাসন ব্যবস্থা।
সরকারি প্রকল্পে নয়, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বালু উত্তোলনের অভিযোগ
‘আইকনিক সোর্সিং’ কী উদ্দেশ্যে এত বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করতে চায়, সে বিষয়েও প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে বালু সরকারি কোনো প্রকল্পে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বরং বালু বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে উত্তোলন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে অনাপত্তি দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অনাপত্তির নথিতে সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রাতে স্বাক্ষরের বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অবস্থান বদলেছে ভূমি মন্ত্রণালয়
শুধু বিআইডব্লিউটিএর অনাপত্তি নয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে অনাপত্তি বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে সম্প্রতি একই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলনের বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দেয়।
চিঠিতে কাটার সাকশান ড্রেজার ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, ‘আইকনিক সোর্সিং’ এ ধরনের ড্রেজার কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিএতে নিবন্ধিত নয়।
নদীভাঙন ঠেকাতে ৫২৭ কোটি টাকার প্রকল্প
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসককে দেওয়া এক চিঠিতে জানান, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙন রোধে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।
চিঠিতে বলা হয়, পদ্মা সেতুর ভাটিতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদীতীর ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে ৯ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ড্রেজিংয়ের আওতায় থাকা একটি চর ইতোমধ্যে নদীর মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রেও নদীভাঙনের চিত্র স্পষ্ট বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় একই এলাকায় বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নদীভাঙন রোধে চলমান সরকারি প্রকল্পের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
‘আইকনিক সোর্সিং’-এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি
গত ৪ মে ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর প্রোপ্রাইটর হিসেবে পরিচয় দেওয়া সৈয়দ সাদাব মাহবুব পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য বিআইডব্লিউটিএতে আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতুর মূল ঠিকাদারের ক্রেন চলাচল এবং পলি অপসারণের জন্য দেশীয় ড্রেজার দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরি করা হবে। নিজস্ব অর্থায়নে ওই কাজ করার পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি সরকারকে পরিশোধের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে উত্তোলন করা বিপুল পরিমাণ বালু কোথায় ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আবেদনে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য নেই।
আবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা উল্লেখ করা হলেও প্যাডে প্রতিষ্ঠানের সিল, ওয়েবসাইট বা কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য নেই। আবেদনে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বর্তমানে বন্ধ।
সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে ১১৫/১ নম্বর কোনো হোল্ডিং পাওয়া যায়নি। ১১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ে টিনের তৈরি কয়েকটি ছোট দোকান, লাইব্রেরি, মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও চায়ের দোকান রয়েছে। স্থানীয় হাফসা টেলিকমের মালিক মিয়া হোসেন বলেন, ১১৫/১ নামে কোনো হোল্ডিং নেই। ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের কথাও তিনি কখনো শোনেননি।
পরিচয় গোপন, ঠিকানা নিয়েও অস্পষ্টতা
‘আইকনিক সোর্সিং’-এর হয়ে সরকারি দপ্তরে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করছেন সৈয়দ সাদাব মাহবুবের ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া কাজী মো. লিয়াকত। তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাদাব মাহবুবের মোবাইল নম্বর বা প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা দিতে রাজি হননি।
ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী মো. লিয়াকত বলেন, ‘যেই মাধ্যমে আপনি তথ্য পাচ্ছেন, তারাই ভালো বলতে পারবে।’
কারিগরি কমিটি গঠন
বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া আইনগত ও কারিগরি দিক থেকে সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির প্রধান ও লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার কমিটির নেই; তারা তাদের পর্যবেক্ষণ বা ফাইন্ডিংস জানিয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীভাঙন বাড়তে পারে, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্ধারণ করার বিধান রয়েছে। এ কার্যক্রম স্থানীয় জেলা প্রশাসন পরিচালনা করে।
তিনি বলেন, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে।
প্রকৌশলীদের আশঙ্কা-বাড়তে পারে নদীভাঙন
পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন দুজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একই স্থান থেকে দেশীয় ড্রেজারের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশে গভীর খাদ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাবে আশপাশের নদীতীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, পদ্মা সেতুর এত কাছাকাছি এলাকায় এ ধরনের বালু উত্তোলন শুরু হলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


