আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
গত বছর লিখেছিলাম “পল কাপুর ম্যাজিক”। তখন অনেকেই সেই বিশ্লেষণকে কেবল একটি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই মনে হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক দাবার বোর্ডে নতুন এক বাস্তবতা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
আজ শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ভার্চুয়াল সম্মেলনকে ঘিরে যে রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি হয়েছে, সেটিও সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অবশ্যম্ভাবী দ্রুত প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা জল্পনা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা চলছে। সেই আলোচনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না; বরং এগুলোকে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার ভেতরে রেখেই মূল্যায়ন করতে হয়।
এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো। এটি কেবল দুটি দেশের প্রতিরক্ষা সমঝোতা নয়; বরং ইন্দো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের একটি বৃহৎ কৌশল।
এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্য। একই সঙ্গে রয়েছে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সীমিত করা, পাকিস্তাননির্ভর প্রক্সি সন্ত্রাসবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভারতকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রধান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
এই নীতিগত পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কূটনীতিক ও শিক্ষাবিদ এস. পল কাপুর। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য মনোনীত হন। একই বছরের ১০ অক্টোবর মার্কিন সিনেট তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করে এবং ২২ অক্টোবর শপথ গ্রহণের পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি নতুন বাস্তববাদের ছাপ স্পষ্ট হতে শুরু করে। এর আগে একই পদে ছিলেন ডোনাল্ড লু, যার সময়কার নীতি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তর বিতর্ক ছিল।
এস. পল কাপুর প্রচলিত অর্থে কেবল একজন কূটনীতিক নন। নেভাল পোস্টগ্রাজুয়েট স্কুল এবং হুভার ইনস্টিটিউশনের গবেষক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ভারত পাকিস্তান সম্পর্ক, পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি, জিহাদি প্রক্সি যুদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক বিশ্বাস। দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করতে হবে।
মার্কিন সিনেটে দেওয়া তাঁর সাক্ষ্যে তিনি বলেছিলেন,
“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে অনেকগুলি সাধারণ পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য।”
এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক ভাষণ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপরেখার প্রতিফলন। কাপুরের দৃষ্টিতে ভারত হচ্ছে ইন্দো প্রশান্ত অঞ্চলের অন্যতম প্রধান কৌশলগত স্তম্ভ।
পাকিস্তান সম্পর্কে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট। তাঁর গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে জিহাদি গোষ্ঠী ও প্রক্সি যুদ্ধকে রাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে তাঁর সময়ে পাকিস্তানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আরও শর্তসাপেক্ষ ও কৌশলগত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
চীনের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান একইভাবে সুস্পষ্ট। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উপস্থিতি অর্থনৈতিক নয় শুধুমাত্র; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্প্রসারণ। সেই কারণেই ভারতের নেতৃত্বে আঞ্চলিক ভারসাম্য গড়ে তোলাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্যও গভীর। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সুযোগ যেমন তৈরি হতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয়ের গুরুত্বও বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সূক্ষ্ম ও পরিণত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভূমিকা, তাঁর প্রকাশ্য ভার্চুয়াল সম্মেলন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে যে বিতর্ক ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এস. পল কাপুরের আবির্ভাব দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে আরও বাস্তববাদী এবং ভারতকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে গেছে। পাকিস্তানের প্রক্সি নীতির প্রতি কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি, ভারতের প্রতি কৌশলগত আস্থা এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলার বিস্তৃত পরিকল্পনা তাঁর চিন্তার মূল ভিত্তি। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন এই অধ্যায়ে বাংলাদেশ আর কেবল একজন দর্শক নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র। আর সেই কারণেই আজকের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা, প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং প্রতিটি আঞ্চলিক সমীকরণকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিচার করাই সময়ের দাবি।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


