পলায়ন থেকে নাশকতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতি- গুরুতর অভিযোগে একের পর এক বিভাগীয় মামলা; ইতোমধ্যে সাবেক এসপিসহ ৬ কর্মকর্তার চাকরি গেল

পুলিশ প্রশাসনে শুরু হয়েছে বড় ধরনের শুদ্ধি প্রক্রিয়া। পলায়ন, কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতি, নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ, অসদাচরণ ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা চলছে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও।

এরই মধ্যে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শুনানি শেষ হওয়ার পথে। কারও নথি পাঠানো হয়েছে সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি), আবার কারও চাকরিচ্যুতির অনুমোদনের জন্য সার-সংক্ষেপ গেছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে।

সব মিলিয়ে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ে একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

৬৩ কর্মর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এক নয়। কারও বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ, আবার কারও বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এসব অভিযোগের নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী বরখাস্তসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ইতোমধ্যে পলায়ন ও অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

অন্য পাঁচজন হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

প্রথম দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েও জবাব না পাওয়ায় নয় কর্মকর্তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় রয়েছেন রংপুরের সাবেক আরপিএমপি কর্মকর্তা রুবাইয়াত জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, ইফতেখারুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রওশানুল হক সৈকত, এস এম শামীম, সহকারী পুলিশ কমিশনার মফিজুর রহমান পলাশ, সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইমরুল ও নাহিদ ফেরদৌস। তাদের কেউ বর্তমানে দেশে নেই। ফলে বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সাময়িক বরখাস্ত তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা চলছে।

মুহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ রেঞ্জে সংযুক্ত মো. ফখরুল আলমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত সৈয়দ ইফতেহার আলীর বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে বিভাগীয় মামলার পুনঃতদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও চাকরি হারানোর মতো কঠোর শাস্তি আসতে পারে।

অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে আরও চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।

সাময়িক বরখাস্ত এস এম ফজলুল হকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফা কারণ দর্শানোর প্রক্রিয়া চলছে। রংপুরের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। তাকে বরখাস্তের বিষয়ে পিএসসির মতামত চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন। তালিকায় রয়েছেন ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদও।

অসদাচরণ, দুর্নীতি, নাশকতা ও পলায়নের বাইরে বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তার কারও কারও বিরুদ্ধে কথিত জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় মামলা রয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা চলমান থাকায় কিছু বিভাগীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। এসব মামলার বিচারিক ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কোনো কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হচ্ছে। এ কারণে কয়েকজনের নথি পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে ১৫টি সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে তালিকাটি আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশ্লেষক এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেছেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে কর্মকর্তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, বিচার করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয়।

তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো- রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক অবস্থান নয়, প্রত্যেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হওয়া প্রয়োজন।

পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৩ কর্মকর্তাকে ঘিরে চলমান এই বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে ছয়জন চাকরি হারিয়েছেন। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত, শুনানি ও প্রশাসনিক অনুমোদনের ধাপ চলছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version