মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স ইতোমধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে ‘অন-অরবিট স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ মোতায়েন করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের বৈরী কর্মকাণ্ড থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষা দিতেই এসব সক্ষমতা মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে অনুষ্ঠিত এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ‘এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে’ বক্তব্য দেওয়ার সময় এই ঘোষণা দেন মেইঙ্ক। তাঁর এ বক্তব্যকে মহাকাশে মার্কিন আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র কক্ষপথে মোতায়েন করা হয়েছে, কতটি রয়েছে কিংবা কখন সেগুলো মহাকাশে পাঠানো হয়েছে- এসব বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি মেইঙ্ক। ফলে অস্ত্রগুলোর প্রকৃত সক্ষমতা এখনো গোপনই রয়ে গেছে। মার্কিন সামরিক নথিতে ‘স্পেস কন্ট্রোল’ বলতে প্রতিপক্ষের মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা প্রতিহত, ব্যাহত, দুর্বল বা প্রয়োজনে ধ্বংস করার মতো আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমকে বোঝানো হয়েছে।

মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান মহাকাশভিত্তিক সামরিক তৎপরতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, দুই দেশই মার্কিন স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করা, যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানো এবং মহাকাশে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা অকার্যকর করার প্রযুক্তি উন্নত করছে।

আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সামরিক যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, অবস্থান নির্ণয় ও ন্যাভিগেশন- সব ক্ষেত্রেই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে কোনো সংঘাতে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট অকার্যকর করে দিতে পারলে তার সামরিক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

স্পেস ফোর্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘স্পেস কন্ট্রোল’ সক্ষমতার মধ্যে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক- দুই ধরনের কার্যক্রমই থাকতে পারে। এর মধ্যে কক্ষপথে থাকা প্রতিপক্ষের মহাকাশযানকে ধ্বংস, ক্ষতিগ্রস্ত বা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর পাশাপাশি সাইবার ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পদ্ধতিতে মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ বন্ধ বা ব্যাহত করার সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা অস্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট ধরন প্রকাশ না করায় এর প্রকৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্পেস কন্ট্রোল সক্ষমতার ক্ষেত্রে কাইনেটিক বা সরাসরি ধ্বংসাত্মক ব্যবস্থা ছাড়াও সাইবার আক্রমণ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হস্তক্ষেপ কিংবা অন্যান্য নন-কাইনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা মার্কিন সামরিক কাঠামোয় উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমানে কক্ষপথে মোতায়েন করা অস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ‘গোল্ডেন ডোম’-এর সঙ্গেও মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। পরিকল্পনাটিতে মহাকাশভিত্তিক সেন্সর ও ইন্টারসেপ্টরসহ বিভিন্ন সক্ষমতা ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে। এর উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়ানো। ফলে কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের এই ঘোষণা শুধু মহাকাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকাশকে আরও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ডোমেইন হিসেবে বিবেচনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।

১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করেছে। তবে চুক্তিটি সব ধরনের প্রচলিত বা নন-কাইনেটিক সামরিক সক্ষমতা মহাকাশে নিষিদ্ধ করে না। এই আইনি সীমার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ মহাকাশভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন করে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক মহলে মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মহাকাশে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট অকার্যকর করার সক্ষমতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সেখানে পাল্টাপাল্টি অস্ত্র মোতায়েনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।

২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউএস স্পেস ফোর্স যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ শাখা। এর প্রধান দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সামরিক যোগাযোগ, নজরদারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশভিত্তিক সম্পদ পরিচালনা ও সুরক্ষা।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাহিনীটির কার্যক্রম শুধু স্যাটেলাইট সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিপক্ষের মহাকাশ সক্ষমতা মোকাবিলার দিকেও বিস্তৃত করা হচ্ছে। মার্কিন স্পেস ফোর্সের নীতিগত কাঠামোতে প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতাকে ‘বিঘ্নিত, দুর্বল কিংবা ধ্বংস’ করার মতো কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা ইতোমধ্যে চীনের সমালোচনার মুখে পড়েছে। বেইজিং জানিয়েছে, মহাকাশে মার্কিন সামরিক অস্ত্র মোতায়েন বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে সামরিক সম্প্রসারণ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মহাকাশের সামরিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হিসেবে সামনে এসেছে। অস্ত্রটির প্রকৃতি ও সক্ষমতা গোপন থাকলেও ওয়াশিংটনের এই ঘোষণা স্পষ্ট করেছে- ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতে মহাকাশকে শুধু যোগাযোগ ও নজরদারির ক্ষেত্র হিসেবে নয়, সামরিক প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version