আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

ইতিহাসের মর্মন্তুদ নোংরাংশও ফিরে আসে।কখনই একই পোষাকে, কখনো ভিন্নরুপে। মুখ একই নয়; কিন্তু একই চরিত্র নিয়ে। একই নিষ্ঠুরতা, একই ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, একই ভয় দেখানোর ভাষা, একই প্রশ্নে, রাষ্ট্র কি জনমানুষের নাকি ক্ষমতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি?

‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ’ বইয়ে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সায়েম লিখেছেন এক ভয়ংকর রাতের কথা। সেই রাতের কথা, যখন রাষ্ট্রপতির বাসভবনে ঢুকে তাঁকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করেছিল জিয়াউর রহমান।

বিচারপতি আবু সায়েম লিখেছেন, “জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তার বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, ‘সাইন ইট।’ তার এক হাতে ছিল স্টিক, অন্য হাতে রিভলভার। আমি কাগজটা পড়লাম। আমার পদত্যাগপত্র। যাতে লেখা- ‘অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।”

এরপর তিনি লিখেছেন, “আমি জিয়াউর রহমানের দিকে তাকালাম। ততক্ষণে আট-দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার চারপাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, ‘সাইন ইট।’ আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম।”

একজন রাষ্ট্রপতি। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। একজন প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক। আর তার সামনে অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষমতা-উন্মত্ত জিয়াউর রহমান।

সেদিন একটি কাগজে শুধু একটি স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। সর্বোচ্চ অপমান করা হয়েছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদকে। পদদলিত করা হয়েছিল সাংবিধানিক মর্যাদাকে। আর ইতিহাস রেকর্ড রাখলো ক্ষমতার এক ভয়াবহ অধ্যায়, যেখানে একজন রাষ্ট্রপতির ‘পদত্যাগ’ আসলে ছিল বন্দুকের নলের সামনে আদায় করা একটি স্বাক্ষর।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো যারা একদিন রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকে বুটের নিচে পিষেছিল, তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই কয়েক দশক পর আবার একই রাষ্ট্রপতি পদকে অপমানের মঞ্চে পরিণত করল। এবার জিয়ার স্থলে অভিষিক্ত জিয়ারই পুত্র, তারেক রহমান, যিনি ততদিনে ঢাকা শহরে মূর্তিমান ত্রাস ‘মিষ্টার টেন পার্সেন্ট’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কথা বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। একজন প্রবীণ চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক আনুগত্যের হিসাব মেলেনি। ক্ষমতার দরবারে তাঁর স্বাধীন অবস্থান অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে রাষ্ট্রপতি একসময় দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসেছিলেন, তাঁকেই রাজনৈতিকভাবে অপমানিত হতে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে যে আচরণ করা হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর লজ্জার অধ্যায় হয়ে আছে। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে রেলস্টেশন, একজন রাষ্ট্রপতির মর্যাদার পতন যেন হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার রাজনীতির প্রকাশ্য প্রদর্শনী। তারেক-খালেদার রাজনৈতিক ঔদ্ধত্যের নিদারুণ নোংরাতম কলঙ্কের বয়াণ।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতির পদ কি কেবল তখনই সম্মানের, যখন রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছেমতো চলবেন? আর যখন তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করবেন, নিজের বিবেকের কথা বলবেন, তখন তাঁকে কি অপমান করা যাবে? তাঁকে কি জনসমক্ষে হেয় করা যাবে? তাঁকে কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীকে পরিণত করা যাবে? তাঁকে কখনো বুটের দাপনে আর বন্ধুকের নলের মুখে কিংবা চ্যাং-দোলা করে রেলস্টেশনে শারীরিক নির্যাতনে বা চারপাশে বুলেটের ঘায়েল-ধ্বনিতে পিষ্ট করে সরে যেতে বাধ্য করা হবে? একই গল্প ফেঁদে, ‘শারীরিক অসুস্থতা!”

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিজেই দিয়েছে। ৪৯ বছর আগে এক রাষ্ট্রপতির শোবার ঘরে বন্দুক তাক করে বলা হয়েছিল, ‘সাইন ইট।’

আজ, চার দশকেরও বেশি সময় পর, আবারও রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে সেই একই ক্ষমতার অপভাষা, সেই একই রাজনৈতিক নির্মমতা, সেই একই ‘সরিয়ে দাও’ সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি। জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক জিঘাংসার ইতিবৃত্ত।।

শুধু সময় বদলেছে। চরিত্র বদলায়নি। তখন ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। আজ তারই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন অনুগতবাহিনী। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সায়েম। আজ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

ইতিহাসের এই মিলগুলো নিছক কাকতালীয় নয়। এগুলো একটি রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।যে রাজনীতি ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখে না; দেখে ব্যক্তিগত চাহিদার ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবে।
জিয়া পরিবারের রাজনীতি রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না, বরঙ দেখে দখল করার সম্পত্তি হিসেবে। বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারমূলক রাজনীতি রাষ্ট্রপতিকে সম্মান করে না, সম্মান করে কেবল সেই রাষ্ট্রপতিকে, যিনি ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার প্রতিধ্বনিত পুতুল হয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের সবচেয়ে কালো অধ্যায় এখানেই। ক্ষমতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গণতন্ত্রের নয়, সেটা কেবলই সবকিছু নিজ নিয়ন্ত্রণের জন্য। রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে না চাওয়া এবং প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে চাওয়াই জিয়া পরিবারের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের গড়ে ওঠা ‘কালচার’।

জিয়া পরিবারের সৃষ্ট এই ‘কালচার’-এ রাষ্ট্রপতি যদি স্বাধীন হন, তিনি শত্রু। রাষ্ট্রপতি যদি প্রশ্ন করেন, তিনি সমস্যা, রাষ্ট্রপতি যদি নিজেরও সাংবিধানিক অবস্থান থেকে কথা বলেন, তাঁকে সরিয়ে দিতে হবে। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের নয়। এটি ক্ষমতার অপরাজনীতি।

আর ক্ষমতার অপরাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো এটি কখনও নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না। বরঙ অতীতের অপরাধকে ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত বানায়।

একসময় যে জিয়া পরিবার রাষ্ট্রপতির পদ-কে অপমানিত করার ইতিহাস তৈরি করেছিল, তারই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যখন আবার রাষ্ট্রপতি পদকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় বসায়, তখন প্রশ্ন উঠবেই এ কি কেবল ক্ষমতার পালাবদল, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ কোনো দলের সম্পত্তি নয়। বঙ্গভবন কোনো রাজনৈতিক দলের দলীয় কার্যালয় নয়। রাষ্ট্রপতি কোনো রাজনৈতিক নেতার কর্মচারী নন। আওয়ামী লীগের মেয়াদ শেষ হবার সেই সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে আওয়ামী লীগ স্বসম্মানে অবসর জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে দেয়ার চমৎকার গণতান্ত্রিক সুস্থতা জিয়া পরিবারের হাতে বারবার খুন হয়।

রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতীক। তাঁকে অপমান করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; অপমান করা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে। অপমান করা সংবিধানকে। অপমান করা বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌমত্বকে।

কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। ক্ষমতার দম্ভে যারা ভেবেছিল তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে, ইতিহাস তাদের কাউকেই ক্ষমা করেনি। বুটের নিচে চাপা দেওয়া স্বাক্ষরও একদিন ইতিহাসের নোংরা দলিল হয়ে ফিরে আসে। রেলস্টেশনে রাষ্ট্রপতির অপমানও একদিন রাজনৈতিক জিঘাংসক অংশ হয়ে যায়।

আর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে কাউকে সরানোর ঘটনাও একদিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রপতিকে সরানো হয়েছিল সংবিধানের নিয়মে, নাকি ক্ষমতার নিয়মে? সময় হয়তো উত্তর দেবে। ইতিহাস ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বলে দিয়েছে।

কেউ কেউ পৃথিবীতে আসে ক্ষমতা ভোগ করতে। কেউ আসে ইতিহাস গড়তে। আর কেউ কেউ ইতিহাসে এমন এক দাগ রেখে যায়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ মনে রাখে ঘৃণা, ক্ষোভ আর নিন্দার সঙ্গে।

জিয়া পরিবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই কালো অধ্যায়ের নাম হয়ে থাকবে। এই বিচার করবে সময়। তবে ইতিহাসের আদালতে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হলো ক্ষমতা হারানো নয়। সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হলো, ক্ষমতার স্বাদ নিয়েও মানুষের শ্রদ্ধা হারানো। জিয়া পরিবার মিথ্যা, জিঘাংসা, অপরাজনীতি গণতন্ত্রের ভিত্তিখুনের কারিগর হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বয়াণে উচ্চারিত হবে।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version