উষ্ণ পৃথিবীতে অস্থির হিমবাহ- বাড়ছে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও মেগাসুনামির শঙ্কা
হিমালয়ের বরফ আর আগের মতো স্থির নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের উত্তাপে দ্রুত গলছে হিমবাহ, দুর্বল হয়ে পড়ছে পাহাড়ের ঢাল। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা- আজকের গলতে থাকা বরফই আগামী দিনের বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিমোড) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তন কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। কোথাও কোথাও ১৯৭৫ সালের পর বরফের পুরুত্ব কমেছে সর্বোচ্চ ২৭ মিটার।
এরই মধ্যে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে পানি, বরফ, পাথর ও কাদার ভয়াবহ স্রোত নেমে এসেছে নদী উপত্যকায়। মুহূর্তেই বিপর্যস্ত হয়েছে বসতি, সড়ক ও সেতু। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দ্রুত উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পার্বত্য ভূপ্রকৃতির অস্থিতিশীলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হিমালয়ের প্রায় ৬৩ হাজার ৭০০টির বেশি হিমবাহ এশিয়ার অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানির উৎস। এসব নদী অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, খাদ্য ও জীবিকা। কিন্তু ছোট হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হওয়ায় একদিকে ভবিষ্যতে পানির সংকট, অন্যদিকে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
শুধু বন্যাই নয়, কোনো হিমবাহ বা বরফ-পাথরের বিশাল স্তূপ পাহাড়ি হ্রদ বা ফিয়র্ডে আছড়ে পড়লে তৈরি হতে পারে ভয়াবহ মেগাসুনামি। বিশ্বের বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে ইতোমধ্যে এমন ঘটনার নজির দেখা গেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে ধসের আগে সতর্ক সংকেত পাওয়া সম্ভব। স্যাটেলাইট, সেন্সর ও ভূ-পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে দ্রুত মানুষ সরিয়ে নেওয়া গেলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
কিন্তু বড় বাধা হলো- হিমালয়ের বিশাল অংশ এখনো পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের বাইরে। ফলে কোথায়, কখন এবং কত বড় ধস নামবে, তা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া এখনো সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে থাকলে আগামী কয়েক দশকে হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
হিমালয়ের দ্রুত বদলে যাওয়া বরফ যেন এক নীরব সতর্কবার্তা- আজ যে বরফ গলছে, কাল সেটিই হয়তো বন্যা, ভূমিধস কিংবা ভয়াবহ কোনো বিপর্যয়ের স্রোত হয়ে নেমে আসবে।


