অমিত গোস্বামীর কলাম
হাচিনা কবে আইব, কইতে পারেন?
আজ সকালে মোবাইলে ঘণ্টাধ্বনি। হোয়াটস অ্যাপ কল। প্রকাশ ফোন করেছে, ঢাকা থেকে। উপস্থিতির জানান দিতেই সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, হাচিনা কবে দ্যাশে আইব, কইতে পারেন? শেখ হাসিনা কবে বাংলাদেশে ফিরবেন, তার খবর আমি কীভাবে জানব? সেটা বলেই বললাম, কী হয়েছে তোমার? হঠাৎ সাত সকালে শেখ হাসিনা নিয়ে…। প্রকাশ উত্তর দিল, কাল রাতে আট ঘণ্টা লাইনে খাড়াইয়া ৪ কেজি গ্যাস পাইছি। পাঁচজনের সংসার টানি ক্যামনে? প্রকাশ আগে রিকশা চালাত, এখন সিএনজি চালায়। আগে বলত ব্যানসন ছাড়া সিগারেট খাই না। এখন? জানি না। বাংলাদেশ এখন দাঁড়িয়েছে খাদের কিনারে। পুরো ‘নেই রাজ্য’। তবে রোয়াব আছে যেমন থাকে কাঙালের।
পশ্চাতে কাপড় নেই, রোয়াব আছে ষোলআনাঃ
রোয়াব আছে কেন বলছি? জুলাইয়ের শেষে ভারত থেকে আমদানিকৃত সাড়ে এগারো হাজার মেট্রিক টন চাল ‘গুনগত মাণ’ ভাল নয় বলে ফেরত দিল বাংলাদেশ। নির্বুদ্ধিতার সেরা নিদর্শণ। কারণ পাঠানো চালগুলি ছিল বাসমতী চাল যা বিশ্বব্যাপী ভারতের পেটেন্টেড। পাকিস্তানের শিয়ালকোট ছাড়া সমমানের চাল উৎপাদন পৃথিবীর কোন দেশ করতে পারে না। সেই চাল ‘রিজেক্ট’ করার অর্থ ভারতের চালের সুনামে কালি ছেটানো। আর বাংলাদেশে চালের মজুত এই বছর পরিমাণের দিক দিয়ে ভালই আছে অর্থাৎ না খেয়ে মানুষ মরে না। ভারত চুপচাপ হজম করে নিল এই অপমান।
কূটনৈতিক বীরঃ
ভারত ইতিমধ্যে ১২-১৩ সেপ্টেম্বরে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে তারেক জিয়াকে আমন্ত্রন জানাল যা মার্কিনী ভয়ে প্রত্যাখান করার সঙ্গে সঙ্গে ভারত আমন্ত্রণ জানাল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। জানিয়ে দিল যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২২ থেকে ২৬ অগাস্ট যে কোনদিন সময় দিতে পারবেন। শেখ হাসিনাকে ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরতের বাহানায় সেটাও গ্রহন করল না বাংলাদেশ সরকার। অথচ সমস্যা ছিল তাদের – ডিজেল-গ্যাস, ফ্রি-ট্রান্সশিপমেন্ট, গঙ্গাজল বন্টন চুক্তি ও ভিসা দান নিয়ে আলোচনা। বাংলাদেশ ‘তাড়াহুড়ো নেই’ বলে এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করল। দেশে কূটনৈতিক বীরের সম্মান পেলেন তারেক জিয়া।
মক্কা চুক্তিঃ
ইতিমধ্যে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা চুক্তি করল যার শর্ত হল একটি দেশ যদি আক্রান্ত হয় তাহলে সদস্য সব দেশ তারা আক্রান্ত হয়েছে বলে ধরে নেবে। নেটোর ৫ নং ধারার সাথে এই শর্তের মিল আছে বলে একে বলা হল ‘ইসলামিক নেটো’। এই চুক্তির পিছনের মতলব সোজা। সৌদি অর্থবান ও ইরানের আক্রমনের ভয়ে কম্পিত, তুরস্ক ড্রোন সমৃদ্ধ (যদিও অপারেশন সিন্দুর-এ এক স্কোয়াড্রন তুর্কী সেনাসহ তাদের ড্রোন ভারত ধ্বংস করেছিল) আর পাকিস্তান, জাত ভিখারির দেশ, তারা সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতিতে সৌদির থেকে অর্থ পাওয়ার লোভে সই করল।
চুক্তিতে যেতে কাঙালপনাঃ
হঠাৎ বাংলাদেশ সরকার এই জোটে যোগ দেবে বলে নাচানাচি শুরু করল। সংসদে প্রস্তাব তুলল। সংবাদ মাধ্যমের প্রচারের মাধ্যম ঘুরে গেল এই সম্ভাবনার দিকে। এই সামরিক জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের লাভ কী? ক্রমে ভিখারি হওয়ার পথে এগোলেও পাকিস্তানের মত জাত ভিখারি তারা নয়। ফলে অর্থ ইস্যু নয়। তাদের দেশের আক্রান্ত হওয়ার ক্ষীনতম সম্ভাবনা নেই। তা’হলে আজ ইরান যদি সৌদি’র ওপরে আক্রমণ করে বাংলাদেশের সেনার সেখানে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ কেন দেবেন? এই জোটে শিয়া ইরান নেই যারা অন্যতম ইসলামিক শক্তি, সংযুক্ত আরব আমীর শাহী নেই, একই অঞ্চলের অন্যান্য অর্থবান কোন ইসলামিক দেশ নেই। কাজেই বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দেওয়া মুর্খের সাথে সহবাস ছাড়া আর কিছু নয়।
বাংলাদেশে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার শ্রমিক বেকারঃ
এবার চলে আসি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। ডিজেল ও গ্যাসের অভাবে বাংলাদেশ ভুগছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে। দৈনিক জীবন থেকে, শিল্প কারখানা, কৃষিখাত , কোল্ড স্টোরেজ চেন সবই বিপর্যস্ত। বাংলাদেশের মুল আয়ের উৎস পোশাক কারখানা ক্রমেই ঝাঁপ বন্ধ করছে। বিকেএমইএ-র সভাপতি গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন যে ৩০০ কারখানা বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহে ক্ষতি হয়েছে দুই মিলিয়ন ডলার। গত পরশুর খবর ময়মনসিঙ্ঘ জেলার ভালুকায় দু’টি বড় কারখানা বন্ধ হয়েছে, কুড়িটি বন্ধ হওয়ার মুখে। ১ লক্ষ ৪৪ হাজার শ্রমিককে আপাতত ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। গত সপ্তাহে সিপিডি এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে গত আট মাসে বাংলাদেশে ৯৫ টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ হারিয়েছেন ৬২ হাজার মানুষ (বিবিসি)। শুধু তাই নয় ১০০ কোটি টাকার কাপড় নষ্ট হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী হাত তুলে দিলেনঃ
এদিকে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন যে এই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এক মাসে মেটানো সম্ভব নয়, দুই বছরও লাগতে পারে। ওদিকে ওষুধ শিল্পের সংগঠন ‘বাপি’র মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান জানিয়েছেন যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ওষুধের দাম বাড়বে কারণ বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১৫ টাকা থেকে ইউনিট প্রতি ৪২ টাকা হয়েছে। পোশাক শিল্পের বিদেশি অর্ডারের বন্যায় ভাসছে ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। ভারতের নয়ডা ও হায়েদ্রাবাদে প্রায় প্রতিদিনই নতুন কারখানার উদ্বোধন হচ্ছে। মেশিনারি, তুলো, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক কিছুরই অভাব নেই। ওষুধ শিল্পে পৃথিবীর বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ ভারত। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চোরাপথে ভারতীয় ওষুধের চাহিদা বেড়েছে। কিছু ভারতীয় কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা আছে। তারা তাদের সেখানকার কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে ভারতের ওষুধ যে আমদানি করবে সেই আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে।
মুখ ফেরালো ভারতঃ
এই সংকট থেকে কে বাঁচাতে পারে বাংলাদেশকে? একমাত্র ভারত। তবে এই সরকারকে ভারত যে কোন সাহায্য যে করবে না তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বেয়াদপির পরে ক্রমশই বোঝা যাচ্ছে। অতিরিক্ত ৩০০০০ ব্যারেল দূরের কথা চুক্তিমত বার্ষিক ডিজেল সরবরাহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষিতে কতটা দেবে সন্দেহ আছে। না দিলেও চুক্তিভঙ্গ হবে না কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল বা গ্যাস দিতে ভারত বাধ্য নয়। আদানি বাদ দিলে ভারতের দামোদর ভ্যালি করপোরেশন, ত্রিপুরা বিদ্যুৎ পর্ষদসহ পাঁচটি সংস্থা বাংলাদেশকে ১১৬০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ভারত চুক্তি অনুযায়ী তার ওপরে সারচার্জ (যদিও খুব কম ইউনিট প্রতি ০.০১ ভারতীয় টাকা) বসিয়েছে। রইল আদানি বিদ্যুৎ। তাদের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া আছে ৫০ কোটি মিলিয়ন ডলার। তার ওপরে টাকা বকেয়া হলে ১.২৫ শতাংশ হারে চক্রবৃদ্ধি হারে জরিমানা (সুদ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি)। ১৪৯৬ ইউনিট বিদ্যুৎ ইতিমধ্যে কমিয়ে ৮০০ মেগাওয়াটে নামিয়েছে। এখন আদানি জানাচ্ছে যে বকেয়া অর্থ দ্রুত না দিলে পুরো বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেবে।
সংকট মোচনের উপায় কী?
নেপাল থেকে ভারতে জলবিদ্যুৎ আসত ৪০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশেও ভারতের গ্রিডের মাধ্যমে যেত। দিন তিনেক আগের দুর্ঘটনায় নেপালের বিদ্যুৎ বন্ধ। ভারতের আদানির বিদ্যুৎ চাই। কাজেই আদানি যে কোন মুহুর্তে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’তে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতে পারে। তাহলে? মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলি দিতে পারবে না। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের টাকা রাশিয়ার কাছে বকেয়া, তারা দেবে না। ভারত ক্ষমাঘেন্না করে ছিটেফোঁটা দিলেও দিতে পারে, তাতে সংকট কাটবে না। বন্ধু চিন দেবে না জানিয়ে দিয়েছে। রইল বাকি আঙ্কল আমেরিকা। তাতে সময় ও ব্যয় আড়াই গুনের বেশি।
অক্টোবরেই দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা, না’হলে…
এই পরিস্থিতিতে খুব দ্রুত বাংলাদেশের পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ হতে বাধ্য। সেখানেও আন্তর্বাহিনী সংঘাত হওয়া অসম্ভব নয়। তাহলে? এই অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ টের পাচ্ছে যে তাদের মসীহা হতে পারেন একজনই। তিনি শেখ হাসিনা। তিনি না ফিরলে ও মসনদে না বসলে এরপরে মায়নামারও লাথি দিতে পারে বাংলাদেশের বুকে। দেখুন, যুদ্ধ আজকাল হয় কূটনৈতিক। এখানেই বাংলাদেশ দশ গোল খেয়ে বসে আছে। তারেক জিয়া ভারতে এলে এতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি হত না। আজ প্রশ্ন? শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন ? পুরোটা নির্ভর করছে আগামী ব্রিকস সম্মেলনে পুটিন, মোদি, শি জিংপিং ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের আলোচনার ওপরে। তবে ডিসেম্বর নয়। অক্টোবরের শেষেই দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। সেটা না ঘটলে বাংলাদেশ সোমালিয়া হবে।
অমিত গোস্বামী
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


