আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাহিনীটির আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল- ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক আনুগত্য এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাহিনীর কিছু প্রতীকী ও নীতিগত পরিবর্তন দেশ-বিদেশে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি নতুন ইউনিট গঠন করেছে, যার চারটি কোম্পানির নাম রাখা হয়েছে ইসলামের প্রথম চার খলিফার নামে- উমর, আবু বকর, আলী এবং উসমান। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রদত্ত ভাষণে সামরিক জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শ অনুসরণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

একসময় যে সেনাবাহিনী নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় নিয়ে গর্ব করত, সেখানে এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল ইউনিটের নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে নতুন এক ইসলামীকরণের সূচনা যা ইত্যকার সেনাবাহিনীর চরিত্রের পুরোপুরি উল্টো পথযাত্রা।

মাত্র এক বছর আগেও, ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন-

“এই দেশ সবার। ধর্ম, জাতি কিংবা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন হবে না। সবাই নির্ভয়ে এই দেশে বসবাস করবে।”

তিনি তখন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি ও বাঙালি, সবাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে এবং সেনাবাহিনী সবসময় সবার পাশে থাকবে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের কমিশনিং প্যারেডে তাঁর বক্তব্যে ভিন্ন সুর লক্ষ্য করা যায়। সেখানে তিনি সামরিক জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আদর্শ অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

এই পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর কেড়েছে। পাকিস্তানি সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলী কে চিশতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ মন্তব্য করেন যে, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসলামী মূল্যবোধ গ্রহণের আহ্বান এবং তাঁর ব্যক্তিগত পরিবর্তনও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি পদাতিক ইউনিটের চারটি কোম্পানির নাম ইসলামের প্রথম চার খলিফার নামে রাখা হয়েছে। প্রচলিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোর নাম ভৌগোলিক, সাংগঠনিক বা সংখ্যাগত ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। ফলে এই ইসলামী নামকরণকে অনেক পর্যবেক্ষক একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম. কে. দাস তাঁর এক নিবন্ধে দাবি করেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনীতে ইসলামী প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর দীর্ঘদিনের প্রভাবও এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেন, নতুন ব্যাটালিয়নগুলোর যুদ্ধধ্বনি “জয় বাংলা” থেকে “আল্লাহু আকবার”-এ পরিবর্তিত হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়না। রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষ স্বাধিকার স্লোগান যখন ইসলামী লেবাসে আহরণ করে, সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন বরাবরের মতো পিছু হাটে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র দুই বছর পর, ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। সেই বৈঠকে কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বিখ্যাত মন্তব্য করেছিলেন-

“আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।”

তবে প্রশংসার পাশাপাশি তিনি একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছিলেন। সাংবাদিক ও বাংলাদেশবিষয়ক গবেষক মানস ঘোষ তাঁর ‘Mujib’s Blunders: The Power and the Plot Behind His Killing’ গ্রন্থে লিখেছেন, কাস্ত্রো শেখ মুজিবকে বলেছিলেন যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অতিরিক্ত উদারতা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কাস্ত্রোর ভাষায়-

“আমি যখন কিউবায় বাতিস্তাকে উৎখাত করি, তখন তাঁর বিশ্বস্ত লোকদের সরিয়ে নিজের লোকদের বসিয়েছিলাম। আপনি যদি তা না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে পাল্টা অপবিপ্লবের ঝুঁকি তৈরি হবে।”

মানস ঘোষের বর্ণনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক পদে পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েও কাস্ত্রো উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এতে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী (অপ)শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। অনেক ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষক এই ঘটনাপ্রবাহ মূল্যায়নের সময় কাস্ত্রোর সেই সতর্কবার্তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি বিবিসি জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইসলামপন্থী কিছু কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা নস্যাৎ করেছে।

তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ মাসুদ রাজ্জাক বলেছিলেন-

“একদল উগ্র ইসলামপন্থী কর্মকর্তা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিল। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।”

তিনি জানান, তদন্তে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সেনাবাহিনীর ভেতরে ইসলামী উগ্রপন্থী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়; বরং এটি বহু বছর ধরেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়।

প্রায় দেড় দশক পর আবারও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে ইসলামী প্রতীক, ইসলামী বক্তব্য এবং সাংগঠনিক পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে কেউ বলছেন, ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সামরিক জীবনের অংশ হতে পারে এবং এটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতিফলন মাত্র। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর প্রতীকী পরিচয়ে ইসলামী উপাদানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। তাছাড়া সেনাবাহিনীর মত নিরেট বাস্তবতাবাদী শক্তিশালী বাহিনীর মধ্যে ধর্মীয় মনস্তাত্ত্বিক বিকাশয়ন কখনোই ভালো হয়না, সেটা আফ্রিকা এবং খোদ পাকিস্তানের অচলায়তনে দৃশ্যমান।

ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৭৩ সালের সেই সতর্কবার্তা যা একসময় কেবল একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য বলে মনে হয়েছিল, আজকের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার আলোচনায় আবারও নতুন করে ফিরে এসেছে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি বাংলাদেশ তার নিজস্ব পথেই এগিয়ে যাবে- সেই উত্তরই এখন সময়ের হাতে। তবে, যে জাতির মধ্যে পেশাজীবি বাহিনীতে ইসলামীকরণ হয়েছে, তাদের বর্তমান অবস্থা দেখে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আঁতকেই উঠতে হয়।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version