সম্পাদকীয় কলাম

রাষ্ট্রের পদে সরকার হয়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; রাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থার প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি সেই মৌলিক দায়িত্ব নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশ আয়নায় দেখছে সেই ভয়াল ২০০১-০৬ এর অন্ধকার যুগ।

হত্যা বাড়ছে, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন থামছে না, শিশুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা শূণ্যের কোঠায়, বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কোথাও কোথাও জায়গা নিচ্ছে মব বা গণপিটুনি। রাজনৈতিক সহিংসতা এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সংখ্যাগুলোই যখন সতর্কবার্তা, তখন বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হত্যা মামলা বেড়েছে ১২৯টি। প্রতিটি হত্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং একটি নাগরিকের অধিকার হারানোর গল্প। প্রশ্ন তাই একটাই অপরাধীরা কি আইনের ভয় হারিয়ে ফেলছে?

নারী ও কিশোরীদের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। HRSS-এর জানুয়ারি-জুন পর্যবেক্ষণে ১ হাজার ৬২১ নারী ও কিশোরী নির্যাতনের তথ্য এসেছে। এর মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার, ২৩৮ জন শিশু ও কিশোরী। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৮৮ জন এবং ধর্ষণের পর নিহত ১৭ জন। ASK-এর জানুয়ারি-জুলাইয়ের হিসাবেও ৪০০ নারী ধর্ষণের শিকার এবং ৩৭ জন ধর্ষণের পর নিহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩২০ নারী।

একজন নারী যদি নিজের ঘরেও নিরাপদ না থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সাফল্য কোথায়? শিশুদের ক্ষেত্রেও চিত্র ভয়াবহ। প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৭৭ শিশু নির্যাতনের শিকার এবং ৩০৫ শিশু নিহত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারে না, তার উন্নয়নের গল্প কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবে প্রথম ছয় মাসে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা এবং ৪৪ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কারণ সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আর আইনের শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত হলো মব সহিংসতা। ASK-এর হিসাবে জানুয়ারি-জুলাইয়ে গণপিটুনিতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। HRSS-এর হিসাবে প্রথম ছয় মাসে মব সহিংসতার ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যদি জনতা বিচারক, জুরি ও শাস্তিদাতা হয়ে যায়, তাহলে আদালতের প্রয়োজন কোথায়?

আরও বড় প্রশ্ন মানুষ কেন আদালতের পরিবর্তে জনতার (অপ)বিচারকে গ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটকেও দেখতে হবে।

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৭ জন নিহত এবং ২ হাজার ৯৭৪ জন আহতের তথ্য পাওয়া গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক মত, মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আটকের ঘটনাকে রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। প্রতিটি মামলায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কারাগারের ভেতরেও রাষ্ট্রের দায় শেষ হয় না। ASK-এর হিসাবে জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ৭১ জন কারাগারে মারা গেছেন। অসুস্থতা, চিকিৎসার ঘাটতি, অবহেলা বা অন্য কোনো কারণ, প্রতিটি মৃত্যুর স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

সবশেষে প্রশ্নটি বিএনপি সরকার কতটা জনপ্রিয় বা রাজনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী তা নয়। প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ? একজন নারী নিরাপদ কি না, একটি শিশু নিরাপদ কি না, একজন সংখ্যালঘু নাগরিক নিরাপদ কি না, একজন রাজনৈতিক কর্মী মত প্রকাশের কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না, আর অভিযোগ উঠলে বিচার হবে আদালতে নাকি রাস্তায়! এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়বদ্ধতা। সরকার যে দলেরই হোক, ক্ষমতায় যারাই থাকুক নাগরিকের জীবন রক্ষা করা, অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধকে রাষ্ট্রীয় হয়রানি থেকে রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব।

আজ বাংলাদেশের সামনে তাই রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপ। হত্যা কমাতে কী করা হচ্ছে? ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? মবের হাতে বিচার বন্ধে রাষ্ট্র কতটা কঠোর? সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি? কারাগারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জবাবদিহি হচ্ছে কি? কারণ রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার মধ্যে নয়; রাষ্ট্র কতজন নাগরিককে নিরাপদ রাখতে পারে তার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; অপরাধকে পরাজিত করা, ভয়কে পরাজিত করা এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শেষ পর্যন্ত সরকার টিকে থাকে ক্ষমতার জোরে, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের আস্থায়। আর সেই আস্থা হারিয়ে গেলে সবচেয়ে বড় পরাজয় কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; পরাজয় হয় রাষ্ট্রের। বিএনপি ২০০১-০৬ এর মত বাংলাদেশকে আবারো এক অতল অন্ধকার গহব্বরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের প্রতিরোধ ছাড়া আর কোনো মুক্তি নেই।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version