দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে আবারও বড় ধরনের ধাক্কার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি পঞ্জিকা বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। এমনকি সরকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগ ও নীতিও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সুফল বয়ে আনতে পারেনি।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ দেশে এলেও এর মধ্যে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুনাফা বা মূলধন হিসেবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ফলে নিট বিনিয়োগ নেমে এসেছে মাত্র ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে মোট ১৫৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল। সেবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ৭৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার প্রত্যাহার করলেও নিট বিনিয়োগ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ২৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। পুনর্বিনিয়োগ থেকে এসেছে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলার, আর আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে এসেছে মাত্র ২ কোটি ৬১ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণ ছিল ৩৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশই নতুন প্রকল্পে নয়; বরং আগে থেকেই পরিচালনাধীন কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে আসে। নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ এখনও আশানুরূপ নয়।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, কয়েক বছর ধরেই দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বল রয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি এবং নীতিগত নানা জটিলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন এফআইসিসিআইর সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উন্নত লজিস্টিকস, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট ১৭৮ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বাংলাদেশ আফ্রিকার উগান্ডা, ঘানা ও ডিআর কঙ্গোর মতো দেশগুলোর চেয়েও কম বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
২০২৫ সালে উগান্ডা পেয়েছে ৩৪০ কোটি ডলার, ঘানা ও ডিআর কঙ্গো প্রত্যেকটি পেয়েছে ১৯০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ। দক্ষিণ এশিয়ায় একই সময়ে ভারত পেয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ১৮৫ কোটি ডলার এবং শ্রীলঙ্কা ১০৪ কোটি ডলারের এফডিআই।
কেবল নীতিগত ঘোষণা বা বিনিয়োগ আহ্বান যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং জ্বালানি-অবকাঠামো সংকটের সমাধান ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব হবে না।


