বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের স্বপ্ন কি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে? বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। গত ১৮ জুন এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই এখন বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিডা।

তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনার ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। আয়োজন করা হয় বিনিয়োগ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক রোডশো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক এবং চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চপর্যায়ের সফর।কিন্তু এত আয়োজনের পরও প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ বাস্তবে দেশে আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বিডা চেয়ারম্যান হিসেবে বহাল রয়েছেন আশিক মাহমুদ। অনেকের ধারণা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত হবে। কিন্তু তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই আশার জায়গায় হতাশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান রয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, করের চাপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বড় উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিল্পকারখানার নিরাপত্তা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থনৈতিক সূচক নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সম্পদের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনকেও বিনিয়োগের প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাদের আস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে যে ঘটনাটিকে উল্লেখ করা হয়, সেটি হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত গাজী টায়ার কারখানার লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ড।জাপানের একটি শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপচারিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা জানান, এখনও বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলে ‘গাজী টায়ার ট্র্যাজেডি’র উদাহরণ সামনে আসে।

তাদের প্রশ্ন একটি সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যা হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস, সেটিকে কীভাবে জনতার একটি অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে? সরকার পতনের পর সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ার কারখানায় ব্যাপক লুটপাট শুরু হয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করে।

লুটের মাল ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষের একপর্যায়ে কারখানায় আগুন লাগানো হয়। কারখানার ভেতরে বিপুল পরিমাণ দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মুহূর্তেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়।অনেক মানুষ ভেতরে আটকা পড়ে প্রাণ হারান। কয়েকদিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। অনেক মরদেহ এতটাই পুড়ে যায় যে তাদের শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি।প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে ভয়াবহতার করুণ চিত্র। কারখানার ভেতরে মানুষের হাড়গোড় পর্যন্ত ছাইয়ে পরিণত হয়েছিল।

প্রশ্ন উঠেছে, দেশের অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো গাজী টায়ার কারখানাকে স্থানীয় জনগণ রক্ষা করার চেষ্টা করল না কেন?স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কারখানা প্রতিষ্ঠার সময় অনেক বাসিন্দা তাদের জমি ন্যায্য মূল্য না পেয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে ছিল।

এছাড়া ব্যবসায়িক বিরোধ ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বও কারখানাটির ধ্বংসের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয়। সেই সম্পর্ক দুর্বল হলে সংকটের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা পায় না।

গাজী টায়ার কারখানা ধ্বংস হওয়ার ফলে শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই হারিয়ে যায়নি; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের উৎপাদন খাতও।দেশে উৎপাদিত টায়ারের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে রিকশা, সাইকেল ও মোটরসাইকেলের টায়ারের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যের একটি বড় অংশ চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিল্পকারখানা ধ্বংসের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো রক্ষার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন।

তাদের মতে, মালিকের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে শিল্পকারখানা ধ্বংসের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।গাজী টায়ার কারখানার ঘটনা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা প্রচারণা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং সম্পদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা। আর সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগের স্বপ্ন বারবার ‘আশায় গুড়েবালি’তেই পরিণত হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version