গত বছরের ২১ আগস্ট সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। পরদিন মুন্সীগঞ্জ এলাকায় মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো তাঁর একটি ‘খোলা চিঠি’ পরে সামনে আসে। চিঠির ফুটনোটে তিনি লিখেছিলেন- ‘জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।’

এক বছর পর সেই চিঠির দিকে ফিরে তাকালে এটিকে নিছক বিদায়পত্র বলে মনে হয় না। বরং এটি হয়ে ওঠে একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের আত্মসমীক্ষার দলিল যেখানে পাশাপাশি উঠে এসেছে বিশ্বাস, অভিমান, পেশাগত অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, অর্থকষ্ট, রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক এবং জীবনের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর অনুশোচনা।

বিভুরঞ্জন সরকার সাংবাদিকতায় এসেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন সংবাদপত্র, রাজনীতি ও আদর্শের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত দৃশ্যমান। স্কুলজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হওয়া, পরে বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ছদ্মনামে লেখালেখি তাঁর জীবনের এসব অধ্যায় পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং এগুলো তাঁর সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থানেরই ধারাবাহিক প্রকাশ।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায় ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে লিখতেন তিনি। নিরাপত্তার কারণে নাম আড়াল করেছিলেন, কিন্তু তাঁর লেখার অবস্থান আড়াল করেননি। সত্য প্রকাশের দায় থেকে সরে দাঁড়াননি।

কিন্তু সাংবাদিকতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁকে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেখানে কলমের শক্তির পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পরও কাঙ্ক্ষিত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার হতাশা তাঁর শেষ লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিভুরঞ্জন লিখেছিলেন- ‘আমার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই।’ কথাটি তাঁর নিজের জীবন সম্পর্কে করা এক গভীর বেদনাময় আত্মমূল্যায়ন। কিন্তু একজন মানুষের সাফল্য কি শুধু অর্থ, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার হিসাবেই নির্ধারিত হয়?

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে একটি বিশ্বাসকে ধারণ করে সাংবাদিকতা করা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কলম না থামানো, নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সাহস রাখা- এসবও তো সাফল্যেরই ভিন্ন সংজ্ঞা। তাঁর শেষ লেখার শেষে উচ্চারিত ‘পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক’ বাক্যটিও তাঁর মানবিক বোধের গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে।

তাঁর শেষ চিঠিতে পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের ছাপ ছিল। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, তাদের পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং উচ্চশিক্ষা নিয়ে তৈরি নানা জটিলতা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা, পেশাগত অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা- সবকিছু মিলিয়েই হয়তো তাঁর ভেতরে তৈরি হয়েছিল গভীর এক মানসিক ভার।

তবে বিভুরঞ্জনের মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর অনেকগুলোর উত্তর আজও স্পষ্ট নয়। এটি কি আত্মহত্যা ছিল? তাঁর চিঠিতে আত্মহত্যার কোনো সরাসরি পরিকল্পনার কথা নেই। কোনো পদ্ধতির উল্লেখ নেই, নির্দিষ্ট কোনো স্থানের কথাও নেই। পরিবারের উদ্দেশে প্রচলিত অর্থে কোনো বিদায়বার্তাও পাওয়া যায় না। আবার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে হত্যার হুমকির কথাও তিনি সরাসরি উল্লেখ করেননি।

বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর গতিবিধি কী ছিল, কীভাবে তিনি মেঘনা নদীর এলাকায় গেলেন, মৃত্যুর আগে শেষ কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল- এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তরও আজও আলোচনার বাইরে নয়। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফল নিয়েও জনপরিসরে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে, সেগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

তাই বিভুরঞ্জন সরকারের শেষ চিঠিকে শুধু মৃত্যুর আগে লেখা কিছু বিষণ্ন বাক্য হিসেবে দেখলে এর গভীরতা ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ভাঙনের গল্প এবং সাংবাদিকতা পেশার দীর্ঘ সংকটের প্রতিচ্ছবি।

একজন সাংবাদিক, যিনি সারাজীবন অন্যের জীবনের সত্য তুলে ধরেছেন, শেষ সময়ে নিজের জীবনকেই যেন একটি প্রশ্নপত্রে পরিণত করে গেছেন। তাঁর প্রশ্নগুলো কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নয়; এগুলো সাংবাদিকতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

একজন মানুষ পাঁচ দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা করার পরও কেন নিজেকে ব্যর্থ মনে করবেন? কেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অবদানের পরও একজন সাংবাদিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন? কেন একজন সত্যনিষ্ঠ কলমযোদ্ধার জীবনের শেষ অধ্যায় এতটা অনিশ্চয়তা ও বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হবে? সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?

বিভুরঞ্জন সরকারকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাঁর জীবনের শেষ দিনের সব অন্ধকারও হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি আলোকিত হবে না। কিন্তু তাঁর লেখা রয়ে গেছে। আর সেই লেখার সবচেয়ে বড় মূল্য কোনো অভিযোগে নয়, কোনো ব্যক্তির নামেও নয়- মূল্য রয়েছে সেখানে রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোতে।

সারাজীবন অন্যের সত্য অনুসন্ধান করেছেন বিভুরঞ্জন সরকার। মৃত্যুর আগে নিজের জীবনকেও তিনি যেন একটি অনুসন্ধানের বিষয় করে রেখে গেছেন। সেই অনুসন্ধানের উত্তর খোঁজা শুধু তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নয়; একই সঙ্গে সাংবাদিকতা, সমাজ ও মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতারও অংশ।

বিভুদার শেষ লেখা তাই কেবল একটি মৃত্যুর গল্প নয়- এটি আমাদের সামনে রেখে যাওয়া একগুচ্ছ কঠিন প্রশ্নের আয়না। সেই আয়নায় তাকানোই হয়তো তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version