ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অবশেষে দেখা মিলছে টুর্নামেন্টের প্রথম প্রকৃত ‘হেভিওয়েট’ লড়াইয়ের। শেষ আটে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্যে আজ যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি স্পেন ও পর্তুগাল। তবে কাগজে-কলমে, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে এবং দলগত ভারসাম্যে স্পষ্টভাবেই এগিয়ে রয়েছে স্পেন।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে লা ফুরিয়া রোহারা। অন্যদিকে পর্তুগাল এখনো অপরাজিত থাকলেও তাদের খেলায় ধারাবাহিকতা ও আধিপত্যের ঘাটতি চোখে পড়েছে। ফলে ডালাসের এই আইবেরিয়ান ডার্বিতে স্পেনই শক্তিশালী দল হিসেবে মাঠে নামছে।
ম্যাচটি শুধু দুই দেশের লড়াই নয়, এটি দুই প্রজন্মেরও সংঘর্ষ। একদিকে ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের বিস্ময়কর প্রতিভা লামিন ইয়ামাল। ম্যাচ শেষে হয়তো বিশ্বকাপে রোনালদোর স্বপ্ন শেষ হয়ে যেতে পারে, আবার ইয়ামালের স্বপ্নযাত্রাও থেমে যেতে পারে। তাই এই লড়াই ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে।
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত ফুটবল ও ভারসাম্যপূর্ণ দল। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি তারা। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এরপর ধীরে ধীরে নিজেদের আসল রূপে ফিরেছে স্প্যানিয়ার্ডরা। শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স ছিল চ্যাম্পিয়নসুলভ। আক্রমণ, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণ—সব বিভাগেই তারা ছিল অসাধারণ।
বিশেষ করে মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রির উপস্থিতি স্পেনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। বলের নিয়ন্ত্রণ, খেলার গতি নির্ধারণ এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষেত্রে এই জুটির জুড়ি মেলা ভার। সেই সঙ্গে লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস ও দানি ওলমোদের গতিময় আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অন্যদিকে পর্তুগালের দলে তারকার অভাব নেই। রোনালদোর পাশাপাশি ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস কিংবা রাফায়েল লিয়াওয়ের মতো খেলোয়াড়রা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তবে দল হিসেবে এখনো নিজেদের সেরা ছন্দে পৌঁছাতে পারেনি রবার্তো মার্টিনেজের শিষ্যরা। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তারা জয় পেলেও দীর্ঘ সময় প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে হয়েছে। শেষ মুহূর্তের গোলে জয় নিশ্চিত করে তারা।
রোনালদোকে ঘিরেও আলোচনা কম নয়। বয়সের কারণে তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি এখনো দলের মূল ভরসা, নাকি গনসালো রামোসের মতো তরুণদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া উচিত? তবে প্রতিপক্ষ স্পেনও রোনালদোর সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ করছে না। স্প্যানিশ মিডফিল্ডার গাবি ম্যাচের আগে বলেছেন, “রোনালদো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তার প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।”
দুই দলের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও ইঙ্গিত দিচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের। শেষ সাত দেখায় ছয়টিই ড্র হয়েছে। সর্বশেষ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালও ২-২ সমতায় শেষ হওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে নিষ্পত্তি হয়েছিল। তবে বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় স্পেনকে একধাপ এগিয়ে রাখছেন অধিকাংশ ফুটবল বিশ্লেষক।
স্পেনের জন্য আরও বড় সুখবর, চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠেছেন লামিন ইয়ামাল। টুর্নামেন্টে তাকে ধীরে ধীরে ব্যবহার করলেও এখন তিনি পুরো ৯০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে পর্তুগালেরও বড় কোনো ইনজুরি সমস্যা নেই।
ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে আজকের এই লড়াইয়ে ফুটবলপ্রেমীরা দেখতে যাচ্ছেন বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ। তবে শক্তি, ফর্ম, দলগত সমন্বয় এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় স্পেনই এগিয়ে। এখন দেখার বিষয়, রোনালদোর অভিজ্ঞতা কি ইয়ামালদের তারুণ্য ও স্পেনের আধিপত্যকে থামাতে পারে, নাকি বিশ্বকাপে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে লা ফুরিয়া রোহা।


