সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে ভারতের অত্যাধুনিক সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্রহ্মস’ বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে এই সম্ভাব্য সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ভারতের অস্ত্র রপ্তানি খাতের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক সামরিক শক্তি হিসেবে ভারতের ক্রমবর্ধমান অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়ে উঠবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারত গত এক দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় দেশীয় প্রযুক্তি, গবেষণা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে জোর দেওয়ার ফলে ভারত এখন ধীরে ধীরে অস্ত্র ক্রেতা থেকে অস্ত্র বিক্রেতা দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে।
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে পরিচিত। এটি স্থল, সমুদ্র ও আকাশ- তিন মাধ্যম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায় এবং শব্দের গতির প্রায় তিন গুণ বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা এবং নির্ভুলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রহ্মসের চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অত্যাধুনিক মার্কিন ও ইউরোপীয় অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহারকারী একটি দেশের আগ্রহ ভারতীয় প্রযুক্তির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। কারণ আমিরাতের প্রতিরক্ষা বাজার বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ বি শিভানে বলেন, এই সম্ভাব্য চুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি বড় আত্মবিশ্বাসের বিষয়। এর মাধ্যমে বিশ্বকে দেখানো সম্ভব হবে যে ভারতীয় অস্ত্র ব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তিগতভাবেই উন্নত নয়, বরং বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য।
ব্রহ্মসের পাশাপাশি ভারতের স্বয়ংক্রিয় আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘আকাশতীর’, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ‘আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র, ‘পিনাকা’ রকেট ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং নির্ভুল নিশানার গোলাবারুদ নিয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে আরও বড় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় অস্ত্রের তুলনামূলক কম রাজনৈতিক শর্ত, দ্রুত সরবরাহের সম্ভাবনা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সঞ্জয় আইয়ারের মতে, এই আলোচনা শুধু একটি অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও প্রতিফলন। তার ভাষায়, আবুধাবি এখন আর কেবল ওয়াশিংটন বা ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর ওপর নির্ভর করতে চায় না; তারা বিকল্প এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছে, যেখানে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
গত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে ফিলিপাইন ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে এবং ভিয়েতনামসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চার বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
ব্রহ্মসের মতো উন্নত অস্ত্র রপ্তানির মাধ্যমে ভারত শুধু অর্থনৈতিক লাভই অর্জন করছে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
সব মিলিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্ভাব্য ব্রহ্মস চুক্তি ভারতের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে ভারতের উপস্থিতি আরও জোরালো হবে এবং দেশটি ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।


