আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

বিশ্বরাজনীতিতে প্রতিদিন কোথাও বা কোথাকার সংগ্রামের শিরোনাম হয়, আর কিছু সংগ্রাম দশকের পর দশক ধরে চললেও আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রান্তেই থেকে যায়। বেলুচিস্তান সেই দ্বিতীয় শ্রেণির একটি উদাহরণ, এমনটাই মনে করেন অনেক গবেষক, বিশ্লেষক ও বেলুচ অধিকারকর্মীরা।

বেলুচ জাতীয়তাবাদী বর্ণনায় জানা যায় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট কালাত (Kalat) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানের সঙ্গে এর অন্তর্ভুক্তি জোরপূর্বক ঘটানো হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের সরকারি অবস্থান হলো, কালাতের শাসক আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানে যোগদানের দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। এই দুই বর্ণনার বিরোধ আজও বেলুচ প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু।

স্বাধীনতার দাবিতে বেলুচদের আন্দোলন নতুন নয়। গত কয়েক দশকে একাধিক সশস্ত্র বিদ্রোহ, রাজনৈতিক আন্দোলন, গুম, খুন, গনহত্যা, সামরিক অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু একটা আশ্চর্যের বিষয়, এই সংকট বিশ্বমিডিয়া ও আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী মহলে যে গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তা পায়নি। ফিলিস্তিন নিয়ে মিডিয়া ফোকাস যতটা আলোর তীর্যক, বেলুচদের প্রায় শতাব্দীকাল ব্যাপী কান্না মিডিয়ার আলো পায়না।

এই প্রশ্ন থেকেই আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে, কেন বিশ্বের কিছু সংঘাত ব্যাপক প্রচার পায়, আর কিছু সংঘাত দীর্ঘদিন নীরবতার আড়ালে থাকে? কেন একটি অঞ্চলের মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক আন্দোলনে ব্যাপক আলোচনা হয়, অথচ অন্য অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত থাকে?

অনেকে এই প্রসঙ্গে কাশ্মীরের ইতিহাসও টেনে আনেন। তাঁদের মতে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয় হামলার পর জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে গণভোটের প্রশ্নটি তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল, যার পূর্বশর্ত হিসেবে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এই বিষয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে এবং ভারত, পাকিস্তান ও কাশ্মীরি বিভিন্ন পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন।

হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিপরীতমুখী ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ মনে করেন, ভারতের সামরিক পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়; আবার অন্যরা এটিকে বিতর্কিত সংযুক্তি হিসেবে দেখেন। ইতিহাসের এসব অধ্যায় একপাক্ষিক নয়, বরং বহুমাত্রিক।

তবে বেলুচিস্তান নিয়ে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, যদি মানবাধিকার সর্বজনীন হয়, তবে বেলুচ জনগণের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, কিংবা নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের দাবিগুলো কেন একই মাত্রায় আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায় না? কেন এই ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলন, চলচ্চিত্র, সাহিত্য বা প্রতিবাদ তুলনামূলকভাবে সীমিত?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সহজ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রায়ই নৈতিকতার চেয়ে ভূরাজনীতি, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং গণমাধ্যমের অগ্রাধিকারের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে কোনো কোনো সংকট বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়, আবার কোনো কোনো সংকট দীর্ঘ সময় নীরবতার মধ্যে চাপা পড়ে থাকে।

বেলুচিস্তানের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর শোনা জরুরি। মানবাধিকারের মানদণ্ড যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তবে তা সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত; তাঁদের পরিচয়, ধর্ম, রাষ্ট্র বা ভূরাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন।

বেলুচিস্তান প্রশ্ন তাই শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি, ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং বিশ্বরাজনীতির নির্বাচনী সংবেদনশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বেলুচিস্তান স্বাধীনতা পাক।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version