‘চীন-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অংশীদারত্ব’, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে স্বাগত বেইজিংয়ের

ব্রিকস মহাসম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ভারত-চীন সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে বেইজিং। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে চীন বলেছে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অংশীদারত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এক ব্রিফিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, বেইজিং তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যগুলোর একটি ছিল- চীন ও ভারতের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে বেইজিং।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে ভারতের একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাবে নেওয়া হয় না এবং ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনো শক্তিকে চীনবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না- মোদি এমন অবস্থান জানিয়েছেন বলে চীনা পক্ষের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বেইজিং জানিয়েছে, ভারতের এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বক্তব্যকে তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

এটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ও চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমান্ত উত্তেজনা কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ফলে মোদি-শি বৈঠকে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিকে আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, চীন ও ভারতের জাতীয় বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দুই দেশের উচিত একে অপরের শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগানো এবং পরস্পরের উন্নয়নকে সমর্থন করা।

চীনা মুখপাত্র গুও জিয়াকুনের ভাষ্য অনুযায়ী, শি বলেছেন, চীন-ভারত সম্পর্কের স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য উভয় পক্ষকে বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিসংগত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি একই সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মতপার্থক্যগুলোও আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং দুই দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে ভারতীয় পক্ষের বিবৃতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করতে সীমান্তবর্তী এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ‘অপরিহার্য ভিত্তি’। প্রধানমন্ত্রী মোদি বৈঠকে সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর জোর দেন।

দুই নেতা বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ভারত ও চীনের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সীমান্ত সমস্যার একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন বলেও জানানো হয়েছে।

ভারতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন সংঘাত বা বিবাদে রূপ না নেয়। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ- এই তিন নীতিকে সম্পর্ক পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফলে ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে মোদি-শি বৈঠককে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছে না দুই দেশ। সীমান্ত ইস্যু, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, পারস্পরিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা- সব মিলিয়ে ভারত-চীন সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে নেওয়ার একটি বার্তা এসেছে দুই পক্ষের বক্তব্যে।

বিশেষ করে ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি চীনের প্রকাশ্য স্বাগত এবং একই সঙ্গে সীমান্তে শান্তি ও বিদ্যমান চুক্তি মেনে চলার ওপর ভারতের জোর- দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথে এই দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version