ভারতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী রবিন খুদা। এই বিশাল বিনিয়োগের খবর প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন একজন বাংলাদেশি উদ্যোক্তা যদি প্রতিবেশী ভারতে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের বাংলাদেশে আসেনি কেন?
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলের দাবী, এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের চরম ঘাটতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির তীব্র অবনতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার অভাব।বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন দেশে বিনিয়োগ করতে চান, যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এসব সূচকের অনেক ক্ষেত্রেই উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দেশে শিল্প স্থাপন কিংবা বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সীমাহীন দুর্নীতি, আইন শৃঙ্খলার চরম অধঃপতন, অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রিতা, করনীতির অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক খাতে নানা সংকট বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ।
অন্যদিকে ভারত গত এক দশকে বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের একটি শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ভারতে উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল অঙ্ক। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই পরিমাণ অর্থ দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ হলে লক্ষাধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারত। কোনো উদ্যোক্তা কোথায় বিনিয়োগ করবেন, তা মূলত ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, বাজারের আকার, নীতিগত সুবিধা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। তাই শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয় না; বরং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশই মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যা বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায়।অসম্ভব।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, বিনিয়োগ নিরাপত্তা এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশীয় ও প্রবাসী উদ্যোক্তাদের বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।
রবিন খুদার ভারতের এই বিশাল বিনিয়োগ তাই শুধু একটি ব্যবসায়িক সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিনিয়োগকারীরা মূলত নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং লাভজনক পরিবেশ খোঁজেন। সেই পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ কতটা সফল হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি।


