বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে যখন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ একের পর এক ইতিহাস গড়ছে, তখন বাংলাদেশ আবারও রয়ে গেল দর্শকের কাতারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে অন্য দেশগুলো জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গৌরব কুড়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই পদক তালিকায়, নেই আলোচনার কেন্দ্রেও। এই বাস্তবতা শুধু ক্রীড়াবিদদের নয়, রাষ্ট্রের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ভারত দেখিয়েছে কীভাবে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও সুশাসনের মাধ্যমে একটি দেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। মাত্র একদিনেই ১৬টি পদক, যার মধ্যে ৮টি স্বর্ণ। বক্সিংয়ে এক আসরে ১০টি পদক জিতে ভারত গড়েছে নতুন ইতিহাস। পুরো আসরে ৩৯টি পদক নিয়ে তারা চতুর্থ স্থানে অবস্থান করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও কানাডাও নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? আবারও শূন্য হাতে দেশে ফেরা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেও এমন কোনো সাফল্য নেই, যা বিশ্বকে বাংলাদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। প্রশ্ন উঠছে-এই ব্যর্থতার দায় কি শুধু খেলোয়াড়দের, নাকি রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া নীতি ও সরকারেরও?
আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক কোচিং এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অথচ বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে এসব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রতিযোগিতার আগে স্বল্পমেয়াদি ক্যাম্প, সীমিত প্রস্তুতি এবং ফেডারেশনগুলোর দুর্বল কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানের সাফল্য এনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সরকার সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের আর্থিক সহায়তা দিলেও সেই বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত মূল্যায়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নিশ্চিত না হলে শুধু অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। ক্রীড়া খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির দায় এড়ানোর সুযোগ সরকারেরও নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতের সাফল্য প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র যখন ক্রীড়াকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করে, তখন পদক আসে, রেকর্ড আসে, বিশ্বস্বীকৃতিও আসে। আর বাংলাদেশে এখনো বহু প্রতিভা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত ক্রীড়া নীতির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন অলিম্পিক, কমনওয়েলথ কিংবা এশিয়ান গেমসে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছে, তখন বাংলাদেশ যেন প্রতি আসরেই একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি করছে। এ অবস্থায় শুধু খেলোয়াড়দের দায়ী করলেই চলবে না; ক্রীড়া খাতের নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সরকারি তদারকির কার্যকারিতাও কঠোরভাবে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই-অভাব দূরদর্শী পরিকল্পনার, পেশাদার ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের। এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলে বিশ্বের ক্রীড়া মানচিত্রে বাংলাদেশ বারবারই পিছিয়ে থাকবে, আর ইতিহাস লিখবে অন্য দেশ।


