দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে ভারত থেকে আমদানি করা নতুন প্রজন্মের ১৯টি লিংকে হফম্যান বুশ (এলএইচবি) কোচ। বুধবার (১২ আগস্ট) ভারতের কাপুরথালার রেল কোচ কারখানা থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য তৈরি প্রথম রেকটি কারখানা ছাড়ার কথা রয়েছে। নতুন এসব কোচ যুক্ত হলে দেশের আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রীসেবায় আধুনিকতার পাশাপাশি নিরাপত্তাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিদা ও দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে কোচগুলো। প্রথম রেকে থাকবে ৩টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শয্যাযান, ৩টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ, ১১টি সাধারণ চেয়ার কোচ এবং ২টি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোচ।

এসব কোচ ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের বৃহৎ চুক্তির অংশ। ২০২৪ সালে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রাইটসের মাধ্যমে কোচগুলো কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চুক্তির মূল্য প্রায় ৯১৫ কোটি ভারতীয় রুপি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পুরো চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।

কাপুরথালার রেল কোচ কারখানায় মোট সাত ধরনের কোচ তৈরি করা হচ্ছে। প্রথম রেকটি দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নেওয়া হবে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। সেখানে কোচগুলোর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কারিগরি যাচাই শেষে যাত্রীবাহী ট্রেনে যুক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

নতুন কোচগুলোতে যাত্রীদের সুবিধার জন্য বেশ কিছু আধুনিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রয়েছে স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পাদানি, হেলানো যায় এমন আসন এবং আংশিক খোলা যায় এমন জানালা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচে ফ্যানের পাশাপাশি থাকবে সমন্বিত সিসিটিভি নজরদারি ও যাত্রী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।

বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে যাত্রীবান্ধব সুবিধার দিকেও। শিশু পরিচর্যার জন্য আলাদা কক্ষের পাশাপাশি থাকছে নামাজের কক্ষ। বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় কোচের ছাদও তুলনামূলক শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে চলন্ত ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠার ঝুঁকি কমানো যায়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কোচগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরোপীয় মান EN 15227 অনুসরণ করে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে যাত্রীদের তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কোচের মূল কাঠামোতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের রেলব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোচগুলোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ৪১৫ ভোল্টে পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় রেলের প্রচলিত কোচে সাধারণত ৭৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়।

এর আগে ২০১৫-১৬ সালে ভারতীয় রেল কোচ কারখানা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি ব্রডগেজ এলএইচবি যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল। তবে এবারের কোচগুলো বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বেশ কিছু পরিবর্তন ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে।

তবে নতুন কোচগুলো কোন ট্রেনে যুক্ত করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো দিয়ে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে, নাকি পুরোনো কোনো ট্রেনের কোচ পরিবর্তন করা হবে- সেটিও পরে নির্ধারণ করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোচগুলো হাতে পাওয়ার পর বিভিন্ন রুটে নতুন রেক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথম রেক দিয়েই নতুন যাত্রীসেবা চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করার আগে প্রতিটি কোচের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করা হবে। এরপর কোন রুটে এবং কোন ট্রেনে এসব কোচ চলবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে, ভারত থেকে আসা নতুন ২০০টি ব্রডগেজ কোচের এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের রেলসেবার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন কোচগুলো ধাপে ধাপে বহরে যুক্ত হলে পুরোনো কোচের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য আরও নিরাপদ, আরামদায়ক ও আধুনিক ট্রেনসেবা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version