নেপালে ভূমিকম্প ও তুষারধসের পর আকস্মিক বন্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশটির চীন সীমান্তবর্তী রাসুওয়া জেলায় প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ পর্যটক, যাদের মধ্যে শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়। আরও ১১১ জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শনাক্ত হওয়া অন্যদের মধ্যে নেপালের স্থানীয় নাগরিক ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার রাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার ভোরে নেপালের রাসুওয়া জেলার চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক এই দুর্যোগ শুরু হয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় প্রথমে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর তুষারধসের ঘটনা ঘটে এবং এর পরপরই আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বত অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর থেকে দেশটির ২৬ জন পুলিশ সদস্য, ৯ জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং ৪৪ জন সামরিক সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জলবায়ু গবেষক রিজন ভক্ত কায়স্থের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তুষারধসের কারণে লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে পরে তা ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিকভাবে পানির প্রবাহ বেড়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপাল পুলিশ ও এএফপির প্রকাশিত ছবিতে বন্যার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। প্রবল স্রোতে নদীর তীরবর্তী বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা গেছে। কোথাও আবার কাদামাটির মধ্যে একটি বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠিয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকাজে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলগুলোকে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করছে নেপাল।
আকস্মিক বন্যায় দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার কারণে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কও বন্ধ হয়ে গেছে।
নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নেপালের অংশে বন্যার পর তিব্বতের গিরং বন্দরে ব্যাপক হতাহত ও বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন।
এদিকে দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর এলাকায় যাওয়া প্রায় ৪০০ তীর্থযাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে তিব্বতে নিহত বা আহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সর্বাত্মক উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ভূমিকম্প, তুষারধস ও আকস্মিক বন্যার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নিখোঁজ পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা আরও স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


