বীণা সিক্রির বিস্ফোরক বার্তা, দিল্লির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

দিল্লিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন সফরকে ঘিরে তেমনই এক বিস্ময়কর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এনেছেন সাবেক কিংবদন্তী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি। তাঁর দাবি, ১২ই সেপ্টেম্বর শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের অন্তরালে ব্রিকস বা বহুপাক্ষিক কূটনীতি নয়, বরং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাক্ষাৎই মুখ্য হয়ে উঠতে পারে।

বীণা সিক্রির বক্তব্য সত্য হলে, এর তাৎপর্য নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করবে। কারণ শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের ক্ষমতার বাইরে অবস্থান করলেও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে তাঁর নাম যে এখনও প্রভাবশালী, এই সম্ভাব্য সাক্ষাৎ তারই ইঙ্গিত বহন করতে পারে। বিশেষত ডিসেম্বরের সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে যদি কোনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনা হয়ে থাকে, তবে সেটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সিক্রির বয়ানে আরও বিস্ময়কর একটি অধ্যায় উঠে এসেছে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে। তাঁর দাবি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন মূলত রাজনৈতিক অভিযোগ জানাতে এবং তথাকথিত ‘মক্কা প্যাক্টে’ যোগদানের বিষয়ে মার্কিন অনুমোদন আদায় করতে। সিক্রির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত হলে হয়তো বিষয়টি সহজ হতো, কারণ নরেন্দ্র মোদিকে তিনি তুলনামূলকভাবে কোমল সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু তাঁর ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের অনুমোদন দেবেন না।

এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। ‘মক্কা প্যাক্ট’ যদি সত্যিই একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতীক হয়ে থাকে, তবে তার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা স্থাপত্যে ঢেউ তুলতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সামরিক বা কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা ভাবনায় কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, সেটিও তখন বিবেচনায় আসবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এই সম্ভাব্য বলয়কে কীভাবে দেখছে, সেটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে যদি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের আলোকে দেখা হয়, তবে চীনের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও নতুন করে ভাবতে হয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতি, চীনের সঙ্গে ঢাকার অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সঙ্গে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বেইজিংয়ের কোনো রাজনৈতিক বার্তা থাকলে তার প্রতিধ্বনি বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

তবে এখানেই প্রয়োজন সংযম। বীণা সিক্রির বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শি জিনপিংয়ের সফর বা শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য বৈঠক সম্পর্কে বেইজিং কিংবা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে এটিকে আপাতত নিশ্চিত ঘটনা নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা যুক্তিসঙ্গত।

তবু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব বার্তা সরকারি বিবৃতিতে লেখা থাকে না। অনেক সময় কূটনীতির আসল ভাষা উচ্চারিত হয় নীরব সাক্ষাতে, বন্ধ দরজার আলোচনায় কিংবা একটি সফরের অপ্রকাশিত উদ্দেশ্যে।

আজ তাই দিল্লির আকাশে কেবল শি জিনপিংয়ের বিমান অবতরণের অপেক্ষা নয়। অপেক্ষা আরও বড় এক প্রশ্নের। বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি কি ঢাকায় লেখা হবে, নাকি তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা দিল্লি, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক টেবিলেই রচিত হচ্ছে?

তারেক রহমানের ওয়াশিংটন সফর যদি সত্যিই কোনো নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের অনুমোদন আদায়ের প্রচেষ্টা হয়, আর একই সময়ে শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরের কেন্দ্রে যদি শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা থাকে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির দাবার ছকে বাংলাদেশ যে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হয়ে উঠছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।

রাজনীতির মঞ্চে শেষ কথা বলে ক্ষমতা নয়, সময়। আর সময়ই বলে দেবে, সেপ্টেম্বরের দিল্লি সফর কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর ছিল, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য নেপথ্যে লেখা হয়েছিল নতুন কোনো অধ্যায়ের প্রথম বাক্য।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version