বয়স মাত্র ১৫ বছর। যে বয়সে অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী স্কুলের পড়াশোনা, খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছেন বেলজিয়ামের তরুণ মেধাবী লরাঁ সিমন্স। অসাধারণ একাডেমিক সাফল্যের কারণে তাকে অনেকে ‘বেলজিয়ামের লিটল আইনস্টাইন’ বলে অভিহিত করছেন।

বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্পে তিনি তাঁর ডক্টরাল গবেষণার আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘Bose polarons in superfluids and supersolids’। গবেষণায় অতি-ঠান্ডা কোয়ান্টাম পদার্থ, বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট এবং সুপারফ্লুইড ও সুপারসলিড অবস্থায় কণার আচরণ নিয়ে কাজ করা হয়েছে।

লরাঁর শিক্ষাজীবনের গতি শুরু থেকেই ছিল ব্যতিক্রমী। মাত্র চার বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে পড়াশোনা এগিয়ে নেন। আট বছর বয়সেই তাঁর মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ হয়ে যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

১১ বছর বয়সে তিনি ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্প থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিন বছরের যে কোর্স সাধারণত শিক্ষার্থীদের শেষ করতে হয়, লরাঁ সেটি প্রায় ১৮ মাসেই সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে ১২ বছর বয়সে তিনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেন।

এরপর তাঁর গবেষণার পথ আরও গভীর হয়। ১৫ বছর বয়সে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি বিশ্বের অন্যতম কম বয়সী ডক্টরেটধারী হিসেবে নজর কাড়েন। তবে ‘বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ পিএইচডিধারী’ হিসেবে নিশ্চিতভাবে তাঁকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন; ঐতিহাসিকভাবে জার্মানির কার্ল ভিটে ১৩ বছর বয়সে ডক্টরেট অর্জন করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

লরাঁর পিএইচডি গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে Bose-Einstein condensate (BEC)- অতি নিম্ন তাপমাত্রায় তৈরি এমন এক বিশেষ কোয়ান্টাম অবস্থা, যেখানে বিপুলসংখ্যক কণা সম্মিলিতভাবে একটি কোয়ান্টাম সিস্টেমের মতো আচরণ করতে পারে।

তাঁর গবেষণায় ‘পোলারন’ নামের একটি কোয়াসিপার্টিকল বা কার্যকর কণার আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সুপারফ্লুইড ও সুপারসলিড পরিবেশে এসব কণার বৈশিষ্ট্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা নিয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্পের প্রকাশিত গবেষণা-সারাংশে চার্জড বোস পোলারন এবং ডাইপোলার সুপারসলিডে পোলারনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছে।

এই গবেষণার সঙ্গে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র রয়েছে। বোসের কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান এবং পরবর্তীতে আলবার্ট আইনস্টাইনের কাজ থেকেই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেটের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়। লরাঁর গবেষণা সেই বৃহৎ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ধারারই আধুনিক একটি অংশ।

লরাঁর গল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিক শুধু তাঁর বয়স নয়, ভবিষ্যৎ লক্ষ্যও। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মানুষের আয়ু বাড়ানো এবং একসময় অমরত্বের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা।

এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তাঁর দাদা-দাদির হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। প্রিয়জনদের অসুস্থতা ও হারানোর অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষের শরীরের ক্ষয়, রোগ এবং বার্ধক্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার আগ্রহ তৈরি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে ‘অমরত্ব’ বলতে লরাঁ যে আগামীকালই মানুষকে চিরজীবী করে ফেলবেন- এমন কোনো বৈজ্ঞানিক দাবি তিনি করেননি। তাঁর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হলো চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম অঙ্গ, প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর করা। তিনি একসময় শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে কৃত্রিম বা যান্ত্রিক অংশ দিয়ে প্রতিস্থাপনের ধারণার কথাও বলেছেন।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি শেষ করেই লরাঁ থেমে থাকেননি। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি জার্মানির মিউনিখে দ্বিতীয় পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন, যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

লরাঁকে ঘিরে আরেকটি বহুল আলোচিত বক্তব্য হলো তাঁর ‘super-humans’ তৈরির আকাঙ্ক্ষা। কথাটি শুনতে অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের মতো হলেও তাঁর ব্যাখ্যার সঙ্গে বিষয়টি মূলত চিকিৎসা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি, রোগ প্রতিরোধ এবং মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবনকাল বাড়ানোর মতো প্রযুক্তির উন্নয়নকে তিনি ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তাঁর পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে একত্র করে মানুষের শরীর ও রোগ নিয়ে নতুন সমাধান খোঁজাই তাঁর বড় লক্ষ্যগুলোর একটি।

লরাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের দ্রুততা নয়। তাঁর গবেষণা ও একাডেমিক যাত্রা দেখায়, তিনি খুব অল্প বয়স থেকেই উচ্চতর পর্যায়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্পের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পিএইচডি গবেষণা ছিল পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণার অংশ এবং এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাক টেম্পের ও মিশিয়েল ওয়াউটার্স যুক্ত ছিলেন।

অর্থাৎ, ১৫ বছর বয়সে পিএইচডি অর্জনের গল্পটি শুধু বয়সের রেকর্ড নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের নিবিড় পড়াশোনা, গবেষণা এবং কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে কাজ করার সক্ষমতা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version