দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, রাতজাগা পড়াশোনা ও সংগ্রাম পেরিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পেয়েছিলেন রাহুল দাস। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণের দিন শেষ মুহূর্তে ভেরিফিকেশনের কারণে তার নিয়োগ আটকে যাওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
‘মা, প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে’- দীর্ঘ অপেক্ষা আর সংগ্রামের পর মাকে এ কথাটিই জানিয়েছিলেন সিলেটের বানিয়াচংয়ের রাহুল দাস। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা ঘুচবে, বদলে যাবে জীবনের গল্প- এমন স্বপ্নই দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়োগপত্র পাওয়ার দিন সেই স্বপ্নই যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।
সব ধাপ পেরিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত নিয়োগপত্র হাতে পাননি রাহুল। আর মাকে সেই দুঃসংবাদটি কীভাবে জানাবেন- সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে রাহুল লিখেছেন, ‘যে মুখ দিয়ে মাকে বলছিলাম, মা প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে, সেই মুখ দিয়ে এখন মাকে কীভাবে বলব- মা, ভেরিফিকেশনে আটকাই দিছে।’
রাহুলের বাড়ি সিলেটের বানিয়াচংয়ে। পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির আশায় ছুটেছেন তিনি। বেকারত্বের দীর্ঘ সময়, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকারি চাকরির স্বপ্ন ছাড়েননি। অবশেষে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়োগের শেষ ধাপে এসে ভেরিফিকেশনের কারণে আটকে যায় তার নিয়োগ।
রাহুলের নিজের কথায় উঠে এসেছে দীর্ঘ বেকারত্বের যন্ত্রণা। তিনি লিখেছেন, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশ পাওয়ার পর ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই সময়ে তাকে হাওরে মাছ ধরে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে রাহুল আরও লিখেছেন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত না করলেও পারতেন তারা। তার দাবি, দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের নিয়োগের পথ দ্রুত পরিষ্কার করা উচিত।
রাহুলের নিয়োগ আটকে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিচিতজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা রাহুলকে পরিশ্রমী, মেধাবী ও সংগ্রামী তরুণ হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কানজিল রায় জীবন এক পোস্টে রাহুলের নিয়োগ আটকে যাওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, রাহুল নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ও এর ভিত্তিতে নিয়োগ আটকে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রাহুলের চাকরির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
সজল দাস নামে রাহুলের এক পরিচিত লিখেছেন, তারা দুজন একসঙ্গে রিডিং রুমে অসংখ্য রাত পড়াশোনা করে কাটিয়েছেন। তার প্রশ্ন- চাকরি পাওয়ার পরও কোন তদন্তের ভিত্তিতে রাহুলকে বাদ দেওয়া হলো?
পঙ্কজ দাস লিখেছেন, ঢাকায় রাহুলের সঙ্গে কয়েক দিন থাকার সময় তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, রাহুল সারারাত পড়াশোনা করতেন এবং সকালে টিউশনি করতে বেরিয়ে যেতেন। তার প্রশ্ন, এত পরিশ্রমী একজন মানুষের চাকরি কেন শেষ মুহূর্তে আটকে যাবে?
বিষ্ণু রায়ও রাহুলকে দীর্ঘদিন হলের রিডিং রুমে পড়াশোনা করতে দেখেছেন বলে জানান। তার ভাষ্য, এমন একজন পরিশ্রমী মানুষের সঙ্গে কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
আরেকজন নাসিম তার পোস্টে অভিযোগ করেন, পুলিশ ও এনএসআই ভেরিফিকেশনের নামে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বঞ্চিত প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানান।
রাহুলের ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে উঠে এসেছে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রামের কথাও। লিমন হালদার নামে একজন রাহুলের পরিবারের সংগ্রামের কথা তুলে ধরে লিখেছেন, হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে গেলে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই কতটা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই রাহুলের মতো একজন তরুণ দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও চাকরির প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। অবশেষে সরকারি চাকরির সুপারিশ পাওয়ার পর পরিবারকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়োগপত্র না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।


