১৯৭১ থেকে বেলুচিস্তান, কাশ্মীর ও আফগানিস্তান- পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ, গুম ও নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস

রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার বাহিনী- নাকি রাষ্ট্রের ভেতরেই দমন-পীড়নের প্রধান শক্তি? পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন প্রশ্নই বারবার সামনে আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া, কাশ্মীর এবং সাম্প্রতিক আফগানিস্তান- বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম, বেআইনি আটক ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

এ ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭১। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’কে ঘিরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং গ্রাম-শহর ধ্বংসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। Human Rights Watch-এর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও ধর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশি সূত্রে প্রায় ৩০ লাখ নিহতের হিসাব প্রচলিত; Human Rights Watch বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিসাব হিসেবে ৩ লাখ থেকে ৩০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করেছে।

অর্থাৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো- নিজ দেশেরই জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা। ১৯৭১ সালে সেই জনগণ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক আন্দোলন দমন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। পরিণতিতে সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়।

১৯৭১-এর পরও পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব কমেনি। ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাসে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সামরিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।

Human Rights Watch-এর ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ধারাবাহিক সামরিক শাসনকে নাগরিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতগুলোর একটি বেলুচিস্তানে। বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের নামে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর গুম, বেআইনি আটক, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এসেছে। Human Rights Watch(HRW) বেলুচিস্তানে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক গুমের একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন নথিভুক্ত করেছে। তাদের তদন্তে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগসহ একাধিক ঘটনা উঠে আসে।

সাম্প্রতিক সময়েও পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। Human Rights Watch-এর ২০২৬ সালের পাকিস্তান প্রতিবেদনে বেলুচিস্তানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া পাকিস্তানের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), আইএস-খোরাসানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী বছরের পর বছর বেসামরিক মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে অঞ্চলটির সংকটকে শুধু ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ হিসেবে দেখলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক অভিযোগ হলো-দেশটির ভূখণ্ডে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০১৯ সালে বলা হয়েছিল, পাকিস্তান আফগানিস্তান ও ভারতকেন্দ্রিক কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আফগান তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের পাশাপাশি লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠনের পাকিস্তানি ভূখণ্ডে কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়।

২০২২ সালের মার্কিন প্রতিবেদনে আবারও বলা হয়, লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র-নিষিদ্ধ সংগঠন পাকিস্তানের মাটিতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। একই প্রতিবেদনে পাকিস্তান এসব সংগঠন পুরোপুরি dismantle করতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।

তবে একই সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেও টিটিপি, আইএস-খোরাসান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার বড় লক্ষ্য হয়েছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ফলে পাকিস্তানকে কেবল ‘জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে একমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করলে সংঘাতের পূর্ণ বাস্তবতা বাদ পড়ে যায়।

পাকিস্তানি সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক সবচেয়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আফগানিস্তানে।

জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশন-UNAMA- জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাতের কারণে আফগানিস্তানে অন্তত ৭০ জন বেসামরিক নিহত এবং ৪৭৮ জন আহত হন। ২০২৫ সালের ১০ থেকে ১৭ অক্টোবরের সংঘাতেই নিহত হন ৪৭ জন এবং আহত ৪৫৬ জন।

২০২৬ সালের ২১-২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বিমান হামলায় আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নিহত এবং সাতজন আহত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য দেয় UNAMA। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।

এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত UNAMA মোট ১৮৫ জন বেসামরিক হতাহত যাচাই করে- ৫৬ জন নিহত এবং ১২৯ জন আহত। তাদের ৫৫ শতাংশই ছিল নারী ও শিশু।

আরও গুরুতর ঘটনা ঘটে ১৬ মার্চ ২০২৬। UNAMA জানায়, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি বিমান হামলা কাবুলের ‘ওমিদ’ মাদকাসক্তি চিকিৎসা হাসপাতালে আঘাত করে। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। জাতিসংঘ স্পষ্ট করে জানায়, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

১৯৭১-এর বাংলাদেশ, বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া, কাশ্মীর কিংবা আফগানিস্তান- ভৌগোলিক বাস্তবতা ভিন্ন, সংঘাতের কারণও ভিন্ন। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘিরে একটি অভিযোগ বারবার ফিরে এসেছে- বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া।

তাই পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করলে দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি আসে- একদিকে সশস্ত্র জঙ্গি ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভয়াবহ সহিংসতা, অন্যদিকে সেই সহিংসতা দমনের নামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version