জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় ১২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ নতুন করে সরকারের কাঁধে যোগ হচ্ছে প্রায় ৫১ হাজার ৯৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকার অতিরিক্ত আর্থিক চাপ।

এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় প্রায় ১৩০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাবের পর একই ধরনের বড় ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব সামনে আসায় মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) প্রকল্পটির প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) প্রস্তুত করেছে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে এক বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড রাখা হবে।

অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্বের পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে দ্বিগুণের বেশি। ডিএমটিসিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের জানুয়ারিতে এই রুটে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রস্তাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১২ হাজার ১২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ২৪ হাজার ২৫৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি ঋণ বা প্রকল্প সহায়তা ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা থেকে প্রায় ১৩৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের কয়েকটি বড় নির্মাণ প্যাকেজে ঠিকাদারদের দেওয়া দরপ্রস্তাব মূল প্রাক্কলনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এসেছে।

সিপি-০৫ প্যাকেজে মিরপুর-১-এর পূর্ব পাশ থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ স্টেশন ও রেলপথ নির্মাণের জন্য মূল ডিপিপিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ব্যয় ৫ হাজার ২১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা নির্ধারণ করলেও দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা জাপানের এসএলটিএম প্রস্তাব করে ১১ হাজার ১৭৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

সিপি-০৬ প্যাকেজেও একই চিত্র। কচুক্ষেতের পূর্ব পাশ থেকে ভাটারা ট্রানজিশন সেকশন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশ নির্মাণে মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৩৬৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। পরামর্শকের প্রাক্কলন ছিল ৬ হাজার ১২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু দরপত্রে তাইসেই-স্যামসাং জয়েন্ট ভেঞ্চার সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করে ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি ২ লাখ টাকা।

ফলে প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজে অস্বাভাবিকভাবে বেশি দরপ্রস্তাব আসায় ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও দীর্ঘ সময় আটকে ছিল বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মূল প্রকল্প অনুমোদনের সময়ের তুলনায় টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। মেট্রোরেলের রোলিং স্টক, রেলওয়ে ও ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সিস্টেম, পরামর্শক সেবা এবং বিভিন্ন আমদানি-নির্ভর খাতে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

জাপানি অর্থায়নের শর্ত এবং নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ও নির্মাণপদ্ধতির কারণে অনেক প্যাকেজে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে যোগ্য ঠিকাদারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এ কারণে ডিএমটিসিএল ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর মধ্যে ঠিকাদারদের উচ্চ দর নিয়ে কয়েক মাস ধরে মতবিরোধও চলেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা ছাড়া উচ্চ ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এর দায় শুধু নির্মাণ ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মেট্রোরেল চালুর পরও ভূগর্ভস্থ রেল ব্যবস্থার পরিচালনা, বিদ্যুৎ, বায়ু চলাচল, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

এমআরটি-৫ নর্দার্ন রুটটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার থাকবে ভূগর্ভস্থ এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে।

রুটটিতে থাকবে মোট ১৪টি স্টেশন- এর মধ্যে ৯টি ভূগর্ভস্থ এবং ৫টি উড়াল স্টেশন। পুরো প্রকল্পটি সিপি-০১ থেকে সিপি-১০ পর্যন্ত ১০টি চুক্তি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।

একদিকে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে ১২৫ শতাংশের বেশি। বিদেশি ঋণের পরিমাণও ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে মেট্রোরেল নির্মাণের নামে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর ঋণ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version