আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত এক ‘ব্যর্থ পরীক্ষায় ব্যর্থ প্রজন্মে’ পরিণত হয়েছে।

আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন এক প্রজন্ম দেখা যাচ্ছে, যারা বিভিন্ন মানসম্মত শিক্ষামূলক পরীক্ষায় আগের সকল প্রজন্মের তুলনায় কম নম্বর অর্জন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান “জেন জি” বা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা তাদের মা-বাবার প্রজন্মের তুলনায় বুদ্ধিবৃত্তিক, বাস্তবসম্মত এবং মানসিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এই প্রজন্ম আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় অনেকটাই দুর্বল। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান কিংবা সামাজিক দক্ষতার মতো বিষয়গুলোতে জেন জি প্রজন্মের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম।

তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি ফাঁপা আত্মবিশ্বাস বা ব্যক্তিগত দম্ভের ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব দক্ষতার চেয়ে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত ফাঁপা আত্মবিশ্বাস দেখা যায়।

গত কয়েক দশকে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট তুলে দিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটির স্কুলগুলোতে ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। কিন্তু এত বড় বিনিয়োগের পরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

ফরচুন সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্য প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাপক আকারে ল্যাপটপ কর্মসূচি চালু করে। তৎকালীন গভর্নর অ্যাঙ্গাস কিং এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের বিশাল তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার দিতে চেয়েছিলেন। ওই বছরই ‘মেইন লার্নিং টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় ২৪৩টি মিডল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে অ্যাপল ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ হাজারে।

এই উদ্যোগ পরে ধীরে ধীরে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত সাফল্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত ফলাফল সামনে এসেছে।

মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী জ্যারেড কুনি হরভথ সম্প্রতি মার্কিন সিনেটের এক কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান এই জেন-জি প্রজন্মের জ্ঞানীয় সক্ষমতা আগের প্রজন্মের তুলনায় কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক পরীক্ষা ‘পিআইএসএ’-সহ বিভিন্ন মানসম্মত পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, স্ক্রিনের সামনে শিক্ষার্থীরা যত বেশি সময় কাটাচ্ছে, তাদের পরীক্ষার ফল ততই খারাপ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এই প্রজন্মের শিক্ষাগত পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পড়াশোনা, সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং মনোযোগ ধরে রাখার মতো প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে জেন জি শিক্ষার্থীদের স্কোর কমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

২০১৪ সালে তিন হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, কম্পিউটার ব্যবহারের সময়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই তারা পড়াশোনার বাইরে অন্য কাজে ব্যয় করে। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শেখার প্রক্রিয়া স্বভাবতই কঠিন ও শ্রমসাধ্য। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের অনেক সময় সহজ বিনোদনের দিকে টেনে নিয়ে যায়, যা গভীর মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যা সমাধানে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে কোন প্রযুক্তি সত্যিই শিক্ষায় সহায়ক এবং কোনটি ক্ষতিকর তা নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ১৭টি অঙ্গরাজ্যে শ্রেণিকক্ষে ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আরও অনেক অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, যদি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, চিন্তাশক্তি এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে জটিল বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করা মানবজাতির জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version