আড়ালে থাকা সম্পর্ক, চাঁদাবাজির অভিযোগ, তরুণীকে হয়রানি- তদন্তে উঠছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য

রংপুরে গত ১৯ আগস্ট একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একাধিক ব্যক্তি, সম্পর্ক, প্রভাব ও সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের জটিল সমীকরণ। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন পর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক বিএনপি নেতা, এক নারী গৃহশিক্ষক, কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার নাম।

নিহতরা হলেন- গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বুলা (৫০), মেয়ে আগমী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৬) এবং ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। আগমী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ছিলেন। আয়ুষ ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারেন ইভা রহমান নামের এক নারী। তিনি চক্রবর্তী পরিবারের প্রতিবেশী এবং আয়ুষের ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়মিত ওই বাড়িতে যাতায়াত করতেন।

পরিবারটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে ইভার সঙ্গে প্রীতিলতার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে রংপুরের পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

২২ আগস্টের পর থেকে ইভা রহমানের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে আলোচনায় থাকা মেরিল সুমনও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতির মেয়ে আগমীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় মেরিল সুমনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের নাম উঠে এসেছে।

পারভেজ, পাভেল, মোমিন মিয়া, আবু হুমায়রা ও আরও কয়েকজন ওই হয়রানিতে জড়িত ছিলেন। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছেলে আশফাক সিফাতের প্ররোচনা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আগমী তাঁর মাকে বিষয়টি জানিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করার অনুরোধ করেছিলেন বলে পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি। একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেশী ও বান্ধবী প্রথা মণ্ডলের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন।

এমনকি হত্যার কয়েক দিন আগে ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথার কাছে আগমী জানতে চেয়েছিলেন, থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে কি না।

গণপতি চক্রবর্তী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দিতেন এবং রংপুর নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মচ্ছাপাড়ায় বসবাস করতেন।

হত্যার কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি তাঁর অসমাপ্ত বাড়ির নির্মাণকাজ আবার শুরু করেন। এর আগে তিনি জিপিএফের প্রায় ১৫ লাখ টাকা উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ওই অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকেই জমা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ, বাড়ির নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি গণপতির কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীও দাবি করেছেন, নির্মাণকাজ নিয়ে গণপতিকে চাঁদাবাজদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল।

তদন্তকারীদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- বাড়ি নির্মাণ, চাঁদাবাজির চাপ এবং আগমীকে হয়রানির ঘটনা কি একই সূত্রে গাঁথা?

মচ্ছাপাড়া এলাকার প্রভাবশালী হিসেবে পুরোহিত ধীমান ঠাকুর ও তাঁর ছেলে প্রণ ভট্টাচার্য পরনের নামও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। ধীমান ঠাকুর দাসপাড়া মন্দিরের কার্যক্রমে প্রভাব রাখেন এবং এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন ও অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, গণপতির বাড়ি নির্মাণের সময় তাঁর ছেলে পরন চাঁদা দাবি করেছিলেন। এ দাবির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ইন্ধন ছিল। এ ছাড়া আগমীর সঙ্গে পরনের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং গণপতি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন- এমন দাবিও পরিবারের একটি সূত্রের। তবে আগমীর বিয়ের বিষয়ে অন্যত্র আলোচনা চলছিল বলেও জানা গেছে।

এই ঘটনাগুলো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামুর নামও বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, চাঁদাবাজ চক্র এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ঘটনার আগে আগমীর হয়রানির অভিযোগ পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ইভা রহমান ও প্রীতিলতা চক্রবর্তী এ বিষয়ে গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এরপর তাঁদের পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

আরও অভিযোগ, পুলিশ কমিশনারকে ইভা রহমানের সঙ্গে একাধিকবার গণপতির বাড়িতে দেখা গেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা সনাতনেরও মচ্ছাপাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং ধীমান ও পরনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল।

তদন্তে মেরিল সুমন, প্রণ ভট্টাচার্য পরনসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়ভাবে অন্তত আরও চারজনের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে।

মেরিল সুমন, ইভা রহমান, আশফাক সিফাত, শামসুজ্জামান সামু, ধীমান ঠাকুর ও প্রণ ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

তবে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।

রংপুরের এই চার খুন এখন শুধু একটি পরিবারের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়; বরং হত্যার আগে সম্ভাব্য হুমকি, হয়রানি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুলিশের ভূমিকা- সবকিছুর সমন্বিত অনুসন্ধানের প্রয়োজন রাখে।

আগমী যদি সত্যিই হত্যার আগে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে থাকেন, গণপতি যদি চাঁদাবাজদের হুমকি পেয়ে থাকেন এবং এসব তথ্য যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছে থাকে- তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই:

হত্যাকাণ্ডের আগে সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কি কেউ যথাসময়ে ব্যবস্থা নেয়নি?

আর যদি নেয়নি, তাহলে কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো রংপুরের চাঞ্চল্যকর চার হত্যার নেপথ্যের আসল রহস্য উন্মোচনের প্রথম দরজা খুলে দিতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version