রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) তহবিল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের নামে উত্তোলন করা প্রায় ২৪ লাখ টাকার মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি। ফলে রাকসুর তহবিলের বড় একটি অংশ কোন খাতে, কীভাবে ব্যয় হয়েছে- তা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। নিয়ম অনুযায়ী ব্যয়ের হিসাব ও প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বিপুল অঙ্কের অর্থের হিসাব না মেলায় রাকসুর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়ের বিবরণীসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

রাকসুর বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য জিএস সালাউদ্দিন আম্মার সাত ধাপে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে মাত্র ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ উত্তোলন করা অর্থের প্রায় ৭৭ শতাংশেরই এখনো হিসাব মেলেনি।

বিশেষ করে তিনটি ধাপে উত্তোলন করা ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার পুরো অর্থের বিল-ভাউচার জমা না পড়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

নথিতে দেখা যায়, গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় বুথ স্থাপনের জন্য ৩ লাখ ২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ২৭ জানুয়ারি রাকসু সদস্যদের জানুয়ারি মাসের বাজেট বাবদ নেওয়া হয় ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। সর্বশেষ ১৩ এপ্রিল রাকসু সদস্যদের দাপ্তরিক খরচের জন্য আরও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়।

এই তিন ধাপে উত্তোলন করা মোট ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো বিল-ভাউচার এখনো জমা না পড়ায় রাকসুর নথিতে ওই অর্থের ব্যয়ের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অর্থগুলো কোথায় এবং কীভাবে খরচ হয়েছে, তা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ার বিষয়ে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ভর্তি পরীক্ষার বুথ স্থাপনের সময় এটি তাদের প্রথম দিকের বাজেট ছিল। তখন ব্যয়ের সঙ্গে ভ্যাট যোগ করার বিষয়টি জানা ছিল না। এ কারণে ৩ লাখ টাকার হিসাব সমন্বয় করে বিল করতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে।

রাকসু সদস্যদের জন্য উত্তোলন করা ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই অর্থের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদকের হিসাব না আসায় তা জমা দেওয়া হয়নি। আরেকটি অর্থের হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে রাকসুর তহবিল ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মসূচি বা দাপ্তরিক কাজ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার কথা। সেই নিয়মের পরও জিএসের নামে উত্তোলন করা ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার হিসাব অনিষ্পন্ন থাকায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, যেকোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিল-ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। রাকসুর কিছু বিল-ভাউচার এখনো জমা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঠিক নিয়মে সেগুলো জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, যেকোনো কর্মসূচি আয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিল-ভাউচারসহ আর্থিক হিসাব জমা দেওয়া উচিত। রাকসুর প্রতিটি অধিবেশনে এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার জন্য কোষাধ্যক্ষকে বলা হয়েছে। কেন এখনো সব ভাউচার জমা পড়েনি, তা তিনি অবগত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিল-ভাউচার জমা দিতে হবে এবং রাকসুকেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

এদিকে শুধু জিএস আম্মারের হিসাবই নয়, রাকসুর সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের হিসাবের ঘাটতি। বর্তমান পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা পড়েনি।

অর্থাৎ রাকসুর তহবিল থেকে বরাদ্দ ও উত্তোলন করা বিপুল অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যয়ের প্রমাণপত্র এখনো নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থের হিসাব বাকি রয়েছে জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের নামে উত্তোলন করা অর্থের।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version